ভারত এখন ‘বিগ ব্রাদার’ হিসেবে নয়, পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী-পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Bhoka Round Table

 

ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে যারা ‘গোলামি চুক্তি’ বলত তারাই এ চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন বলে মায়াকান্না করেছে- দীর্ঘ ৪০ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সেটি বাস্তবায়নের পথে-বললেন পররাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। মোদির সফরে ভিসা সহজীকরণের প্রত্যাশা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা যে কানেকটিভিটির কথা বলছি সে ক্ষেত্রে ভিসা সহজ করা গুরুত্বপূর্ণ। মোদির এ সফর দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডার কথা কেন বলা হচ্ছে?সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হবে। আর ভারত এখন ‘বিগ ব্রাদার’ হিসেবে নয়, পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। তাই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে প্রতিবেশী দেশ দুটির সম্পর্ক নিয়ে সস্তা রাজনীতি করা উচিত নয়। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর ও বাংলাদেশের প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। দৈনিক ভোরের কাগজ এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায়  বিশেষ অতিথি ছিলেন বিজেপির মুখপাত্র এম জে আকবর এবং নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী।

মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ। এই আলোচনায় ছিটমহলের ১২ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

ছিটমহল বিনিময়ের কারণে বাংলাদেশের নিট অর্জন হবে ৯ হাজার ৭৪৩ একর জমি। এই জমি ভারত পেলেই বলা হতো ‘দেশ বিক্রি’ করে দেয়া হয়েছে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে তাকে ঢাকায় স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ শনিবার ঢাকায় আসছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও একই মহান একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত রচনা করেছে ।  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দ্বিতীয় ভিত রচনা করবে।

মূল প্রবন্ধে পদ্মা সেতুতে চীনের বিনিয়োগের তথ্য ভিত্তিহীন বলে এর প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে একটিও বিদেশি পয়সা নেই। বাংলাদেশের মানুষের শ্রমের টাকায় এই সেতু নির্মাণ হচ্ছে। তিনি উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থার যুগে বাণিজ্য ইস্যুতে চীনকে না টানার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বিশ্ব বাজারে চীন এগিয়ে আছে। তাই বলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে তা উদ্বেগের ইস্যু নয়।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেন, দেশ ভাগের ৬৮ বছর আর ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির ৪১ বছর পর ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে মোদি বাংলাদেশে আসছেন। ভারতের পার্লামেন্টে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসকে অনেক বড় সাফল্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে ছিটমহল আদান-প্রদান ছাড়াও অপদখলীয় জমি নিয়ে বিরোধের অবসান এবং ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানা নির্ধারণ সম্ভব হতে যাচ্ছে। দিল্লির মসনদে বসার পর স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের সমস্যার সুরাহা করেই ঢাকায় আসবেন বলেছিলেন মোদি। সেটি করেই তিনি আসছেন, এ জন্য সাধুবাদ জানাই। তিনি মোদির সফরে তিস্তাসহ অমীমাংসিত ইস্যুতে কথা হবে জানিয়ে বলেন, কূটনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আলোচনার মাধ্যমেই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। তবে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের জন্য সমন্বিত সংলাপ দরকার। প্রতিবেশীকে দুর্বল রেখে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ভারতের উদ্বেগের ইস্যু সন্ত্রাস দমন করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছে। আলোচনার মাধ্যমে ঝুলন্ত ইস্যুগুলোর সমাধান করে দুদেশ একসঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা করি।

বিজেপির মুখপাত্র এম জে আকবর ‘৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সফর করছেন জানিয়ে বলেন, “৪০ বছর পর স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পথে। এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে এ বিষয়ে যে চুক্তি হবে সেটিও আমি ঐতিহাসিক মনে করি। একাত্তরে দু’দেশের সম্পর্কে প্রথম ভিত্তি রচিত হয়েছিল। মোদির সফরকালে এই চুক্তি হবে দ্বিতীয় ভিত্তি। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মানুষের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে জানিয়ে বলেন, এ কারণেই ভারতের পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে এমন একটি বিল পাস হলো। এটি সে দেশের জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন, যা এই শতকের একটি ‘মাইলফলক ‘ হয়ে থাকবে।” তিনি মোদির বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণাবলির কথা তুলে ধরে বলেন, রাজ ও রাজনীতির দ্বন্দ্বের কারণে গত ৪০ বছরে যা হয়নি তা এক বছরের মধ্যে করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি সবার কথা শুনে ও বুঝে নিজের সিদ্ধান্ত নেন। আর যে সিদ্ধান্ত নেন সেটি বাস্তবায়নেও তিনি বদ্ধপরিকর। মোদি রাজনীতির আগে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেন। তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জন্মদিনের উৎসব নয়, যে কেক খেয়ে চলে গেলাম। এটি টেকসই সম্পর্কে নিয়ে যেতে হয় সমমর্যাদার ভিত্তিতে। আর এ ব্যাপারে মোদির অবস্থান স্পষ্ট। তিনি কাজে বিশ্বাসী। আর একারণেই তার পররাষ্ট্র নীতিতে অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন থাকে। মোদি দক্ষিণ এশিয়ার ট্র্যাজেডি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে অর্থনৈতিক রেনেসাঁ আনতে চান। আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পাশে চান। বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো মুসলিম রাষ্ট্র নয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আর সন্ত্রাস দমনে বর্তমান সরকারের ‘জিরো টলারেন্স ‘ নীতি। মোদির সফরের মধ্য দিয়ে সেই শুভযাত্রা শুরু হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী মোদির সফরকে দলমত-নির্বিশেষে সকলের স্বাগত জানানোর বিষয়টিকে বড় রকমের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মোদির সফর বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময়। তাই আমাদের নির্ধারণ করতে হবে এ সফরকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করব। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ন্যায্য সুবিধা যেন পাই। দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্কের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মর্যাদাপূর্ণও হতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত রাশেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “ইতিহাসে দেখা গেছে, দ্বিপক্ষীয় ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক পর্যায় থেকে এসেছে। এবার দুদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে আমরা শক্তিশালী রাজনৈতিক এজেন্ডা আশা করছি। নরেন্দ্র মোদির কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি” এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা এশিয়ার শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে। এখন সরকারে সরকারে নয়, মানুষে মানুষে যোগাযোগের যুগ। আর এ কারণেই এদেশের জনগণ আশা করছে মোদির সফরে তিস্তা চুক্তি সই না হলেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সমঝোতার বিষয়টি স্পষ্ট হবে।”

সাবেক সচিব ও কূটনীতিক মোফাজ্জল করিম মোদির সফরে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে এমন প্রত্যাশা করে বলেন, নরেন্দ্র মোদির লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার অবিসংবাদিত নেতৃত্ব। একই সঙ্গে বিশ্ব নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তিনি শক্ত অবস্থানে যেতে চান। আর এ কারণেই সুযোগ্য প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করতে চান।

‘ভারত দাদাগিরি নয়, ভাইয়ের সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়’ ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাম্প্রতিক এমন বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে তিনি আরো বলেন, আমরা ভারতের সত্যিকারের ভাই হতে চাই; সৎ ভাই নয়। এই ভাইয়ের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে গলার কাঁটা হয়ে থাকা তিস্তা নদীসহ সব অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসারে হওয়া এবং সীমান্ত হত্যা একেবারে বন্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এবার মমতাময়ী হয়ে এবারের সফরে আসবেন  প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, মমতার সম্মতি থাকলে মোদি হয়তো বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে চমক দেখাতে পারবেন।

মোদির সফরে তিস্তা চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা হবে এমন প্রত্যাশা করে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ বলেন, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ভারতের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিস্তা বা ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি ভারত জানে না -সেটি আমাদের ব্যর্থতা।

ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের পর মোদি সেটিকে ‘বার্লিন ওয়াল’ পতনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন উল্লেখ করে বলেন, একইভাবে যেন বিদ্যমান অনিষ্পন্ন ইস্যুগুলোর সমাধান করে দুই দেশ সমান তালে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

ভারতীয় পত্রিকা টেলিগ্রাফের সাংবাদিক দেবদ্বীপ পুরোহিত মোদির ঢাকা সফরে জন প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে এমন আশা করে বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বেশি লেখা হওয়া উচিত। আর সে ক্ষেত্রে সত্যি চিত্রটা আসা উচিত। তাহলেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো ভালো হবে।

দি হিন্দু পত্রিকার কলকাতা ব্যুরো চিফ শুভজিৎ বাগচী ছিটমহলে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়াটা একটি বিরাট সাফল্য। এতে করে ছিটমহলগুলোর ৫২ হাজার মানুষের দুর্দশার অবসান ঘটবে। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির (বাংলাদেশ ইউনিট) সভাপতি মো. মঈনুল হক ৬৮ বছরের বন্দি জীবন থেকে পরিত্রাণের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ভারতের ছিটমহলে কমসংখ্যক লোকের জন্য ৩ হাজার ১০ কোটি টাকার প্যাকেজের বরাদ্দ হলেও বাংলাদেশের ছিটমহলের ৩৭ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই ৩৭ হাজার জনগোষ্ঠী এদেশের নাগরিক হওয়ার পর মুহূর্ত থেকে সব সুবিধা পাবে। আর ওই ২০০ কোটি টাকা জরুরি সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ছিটমহলের প্রতিনিধি গোলাম মোস্তফা বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দুদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen + three =