ভয়াল আশির দশক, তিনি কি শুধুই আবৃত্তিকার ?-জাহান এস তিমির

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

ভয়াল আশির দশক, তিনি কি শুধুই আবৃত্তিকার ?

ক’জন জানে তাঁকে সংগঠক হিসাবে ? গু-আযমদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ঐতিহাসিক সেই গণ আদালতে, তারও আগে থেকে শহীদ জাহানারা ইমামের সেই এলিফ্যান্ট রোডের বাড়িতে সাংগঠনিক প্রচারণায় বিস্তারে সমন্বয়ে তাঁর ভূমিকা, তিনি কেমন ভাবে ছিলেন, যারা সেই সময়ে সক্রিয় ছিলেন তাঁরাই জানেন, তাঁরাই দেখেছেন !

শহীদ জাহানারা ইমামের এলিফ্যান্ট রোডের বাড়ির ভিড় তখন উলটো দিকের বাড়িতেও সমান, নেতা কর্মী সংগঠকরা আসছে যাচ্ছে খাচ্ছে, ওখানে থাকতেন প্রজ্ঞা লাবনী আর স্থপতি কাজী আরিফ, দুজনেই আবৃত্তিকার ;জাগ্রত সাংস্কৃতিক বলয়ের বৃত্তে ।
বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোক্তাদের একজন। সারা দেশ ঘুরে আবৃত্তির প্রশিক্ষণ দিয়েছেন । বাংলাদেশে আবৃত্তিচর্চা এবং আবৃত্তিশিল্পকে আধুনিক সংগঠিত রূপ দিতে কাজী আরিফ আশির দশকে অন্যতম ভূমিকা রেখেছিলেন।

হ্যাঁ, আশির দশকে…. যখন সময়কাল অন্যরকম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতাড়িত আর প্রগতিশীল মানুষদের নিঃশ্বাস বন্ধ করে পানিতে ডুব দিয়ে থাকার সময় তখন !

জলপাইরঙা হাঁটু বাহিনীর (আশি/নব্বই দশকে ছাত্ররা অধিক নিষ্পেষিত হয়েছিল, তাঁরা বলতো ”  ‘লেফট- রাইট’ করতে করতে বুদ্ধি গিয়ে ‘হাঁটু’তে ঠেকেছে” ), চিফ জেনারেল জিয়া ‘৭৫ র রক্তগঙ্গা বইয়ে সামরিক পোশাক ছেড়ে সাফারি পড়ে রাজনৈতিক দল গঠন করলেন, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি সিদ্ধ করলেন, ‘৭২ এর সংবিধানের বিপরীতে দেশকে ‘ বিসমিল্লাহ’ র রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চাষাবাদে সফলকাম হলেন, যার পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন আরেক হাঁটু চিফ জেনারেল এরশাদ ।

দুই জেনারেল ই বাংলাদেশ বিরোধী রাজাকার আলবদরদের পৃষ্টপোষকতা করেছেন, ক্ষমতার শীর্ষে বসিয়েছেন;  মসজিদ মাদ্রাসার রাজনীতিতেও এই দুই জেনারেলের পৃষ্টপোষকতা ছিল খুবই সুক্ষ্ম ও নিপুণ -যেখানে নকশী কাঁথার বুনন ও হার মানে !

আশির দশকে ‘ মুক্তিযুদ্ধ’ – ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘ একাত্তরের চেতনা’ , ‘ জয় বাংলা ‘ শব্দগুলি ছিল অলিখিতভাবে ব্যান; প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা চেপে যেতেন নিজেদের পরিচয় ।

কবিতার পাঠক চিরকালই কম ।

কবিতা পাঠ করে কি চেতনায় কড়া নাড়া যায় ? সেই সময় কবিরাও ছিলেন প্রতিবাদী।
তাদের পাশাপাশি, ভাষা – সংস্কৃতি – শুদ্ধ উচ্চারণ ও বাচিকশৈলীর গুরুত্ব সহ আবৃত্তিচর্চা ও কবিতাকে মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেবার জন্যে একদল সংস্কৃতিসেবী সংগঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

কাজী আরিফ সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সেনাপতি ছিলেন !

ঢাকা সহ সারা দেশে ধীরে ধীরে কবিতা পাঠের মাধ্যমে উদ্দীপিত হয়েছিল সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট অনেক বোবা মানুষের চেতনা, রাজাকার আলবদরদের রাজনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ! তবে এখানে উল্লেখ্য, পাশাপাশি থিয়েটার মঞ্চ নাটক ও ছিল সুনিপুন কৌশলে সবাক !

‘১ নম্বর সেক্টর’-এর মেজর রফিকের নেতৃত্বে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়াশোনা শুরু করেন।

শুনেছি, প্রবাদপ্রতিম আবৃত্তিশিল্পী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচীর ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রথমবারের মত প্রদান করা হয়েছে কাজী সব্যসাচী স্মৃতি পুরস্কার ২০১৬। জাদুঘরের মূল মঞ্চে এ পুরস্কার প্রদানের আয়োজন করে কাজী সব্যসাচীর পরিবার।পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী ও অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং কাজী আরিফ পেয়েছিলেন সেই পুরস্কার।
মানুষ যে এখন কবিতা শোনে, কবিতা পাঠের আসর বসে, মানুষ কবিতা আওড়ায়, ইউটিউবে এখন কবিতার চ্যানেল, এসব কিছুর পিছনের কারিগরদের কে মনে রাখে ? তাই ভালো লেগেছিলো জেনে, কাজী আরিফ গুরু মানতেন কাজী সব্যসাচীকে !

আরিফ ভাই, আর কখনো দেখা হবেনা, বিদায়!!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × 4 =