ভয়ে তটস্থ, গ্রাম ছাড়ল ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের হতভাগ্য আসিফার পরিবার

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

বিশেষ প্রতিবেদন সূর্যবার্তা : গণধর্ষণ এবং তারপর হত্যা। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে ভারত জুড়ে। আসিফা বানু নামে ৮ বছর বয়সী এক শিশুকে গণধর্ষণ ও হত্যায়  তোলপাড় চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিচার দাবিতে রাজনীতিক, সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজের নেতা থেকে শুরু করে টলিউড-বলিউডের তারকারা পর্যন্ত সোচ্চার হয়েছেন। শুরু হয়েছে ‘জাস্টিস ফর আসিফা’ (#JusticeForAasifa) হ্যাশট্যাগ প্রচারণাও।

গত ১০ জানুয়ারি কাশ্মীরের কাঠুয়া শহরের রাসানা এলাকা থেকে আসিফাকে অপহরণের পর সপ্তাহখানেক আটকে রেখে ধর্ষণ এবং শেষে হত্যা করা হয়। ১৭ জানুয়ারি রাসানার একটি জঙ্গলে তার মরদেহ পাওয়া যায়। বিষয়টি আলোচনায় এসেছে সম্প্রতি ওই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর।

এ ঘটনায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, চার পুলিশ কর্মকর্তা ও এক কিশোরসহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- অবসরপ্রাপ্ত রাজস্ব কর্মকর্তা সনজি রাম, পুলিশের বিশেষ কর্মকর্তা দীপক খাজুরিয়া, সুরেন্দ্র বর্মা, আনন্দ দত্ত ও তিলক রাজ, সনজি রামের ভাগনে (ছদ্মনাম রামু, অভিযোগপত্রে বয়স ১৯ বছর বলা হলেও সংবাদমাধ্যম ১৫ বছর দাবি করে নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না), তার বন্ধু পারবেশ কুমার (মানু) ও রামের ছেলে বিশাল জঙ্গোত্রা।

পুরো লোমহর্ষক ঘটনার বিষয়ে সংবাদমাধ্যম বলছে, আসিফা বানু সংখ্যালঘু বাকারওয়াল জাতিগোষ্ঠীর ইউসুফ বাকারওয়ালের মেয়ে। গোষ্ঠীটি কাশ্মীরের পাহাড়ি এলাকায় যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায়। ভেড়া চড়ানো এদের জীবিকা-নির্বাহের উপায়। এই গোষ্ঠীর কিছু লোক রাসানা এলাকায় বসবাস করতে এলে এখানকার প্রভাবশালী সনজি রাম তাদের তাড়াতে উঠে-পড়ে লাগেন। বাকারওয়ালদের বিরুদ্ধে মাদকপাচার, গো-হত্যাসহ বিভিন্ন উসকানি ছড়ালেও পেরে উঠছিলেন না উগ্র মানসিকতার সনজি রাম। শেষমেষ তিনি তার ভাগনের মাধ্যমে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পথ বেছে নেন।

অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, বাকারওয়াল গোষ্ঠীকে তাড়াতে সনজি রাম তার ভাগনে রামুকে বলেন ইউসুফের মেয়ে আসিফাকে অপহরণ করতে। তার নির্দেশ মতে রামু এই পরিকল্পনা জানায় তার বন্ধু মানুকে। ৯ জানুয়ারি দুই বন্ধু স্থানীয় একটি দোকান থেকে চেতনানাশক ওষুধ কেনে। ১০ জানুয়ারি আসিফা তাদের ভেড়া চরাতে বের হলে তাকে অপহরণ করে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায় রামু ও মানু।

এরপর তাকে ধর্ষণ করে রামু, মানুও ধর্ষণের চেষ্টা করে। পরে দু’জনে আসিফাকে সনজি রামের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি উপাসনালয়ে তালাবদ্ধ করে রেখে দেয়। ১১ জানুয়ারি আসিফার মা-বাবা মেয়েকে খুঁজতে সনজি রামের কাছে গেলে তিনি তাদের আত্মীয়ের বাড়িতে খোঁজ নিতে বলেন। একই দিন রামু খবর দেয় সনজি রামের ছেলে বিশালকে এবং শিশুটিকে ধর্ষণ করবে কি-না জিজ্ঞেস করে। ১২ জানুয়ারি বিশাল সেখানে গিয়ে রামু-মানুদের সঙ্গে যোগ দেয়।

এদিকে, পুলিশকে জানিয়ে আসিফার খোঁজ চালাতে থাকে বাকারওয়ালরা। এই প্রেক্ষাপটে সনজি রাম বিষয়টি ধামাচাপা দিতে এক পুলিশ সদস্যকে হাত করে ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনন্দ দত্তকে দেড় লাখ টাকা ঘুষ দিতে রাজি করায়। ১৩ জানুয়ারি সকালে বিশাল ও তার বাবা সেই উপাসনালয়ে যায়, সেখানে যায় রামু এবং মানুও। রামু ও বিশাল মিলে ফের ধর্ষণ করে আসিফাকে।

সন্ধ্যায় সনজি রাম তার ছেলে-ভাগনেদের বলেন আসিফাকে মেরে ফেলতে। সে কথা মতো, রামু, মানু ও বিশাল তাকে নিয়ে যায় একটি কালভার্টে। সেখানে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সনজির হাত করে নেওয়া সেই পুলিশ কর্মকর্তা দীপক। আবার ছোট্ট দেহের মেয়েটিকে ধর্ষণ করে রামু এবং দীপক। এরপর দীপক তার চাদর আসিফার গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। রামু মেয়েটির মাথা পাথর দিয়ে থেতলে দেয়। সেখানেই ফেলে রাখা হয় তার মরদেহ। ১৫ জানুয়ারি মেয়েটির মরদেহ নিয়ে ফেলে দেওয়া হয় অদূরের জঙ্গলে। ১৭ জানুয়ারি সেখান থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন স্থানীয়রা, খবর পেয়ে পুলিশ এসে মরদেহটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ৬০ বছর বয়সী সনজি রামই পুরো ঘটনাটির মূল পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী। যে উপাসনালয়ে মেয়েটিকে অপহরণ করে বন্দি রাখা হয় এবং ধর্ষণ করা হয়, সেটি দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন এই সনজি রামই। আর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিল রামু, মানু, বিশাল এবং পুলিশ কর্মকর্তা দীপক। এমনকি পুলিশ কর্মকর্তা দীপক মেরে ফেলার আগে আরও একবার ধর্ষণ করতে চান আসিফাকে।

জানা যায় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি গুজ্জর সম্প্রদায়কে জম্মু ত্যাগ করার জন্য সন্ত্রস্ত করতে চেয়েছিলেন। জম্মুতে এরা জীবিকা নির্বাহ করতে বনভূমি ব্যবহার করে, যা নিয়ে সম্প্রতি এই অঞ্চলের কিছু হিন্দু বাসিন্দাদের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এমনকি আসিফাকে কবরস্থ করার জন্য কবরস্থানে নিয়ে গেলে সেখানে সশস্ত্র কিছু হিন্দু তাদের হুমকি দেয়। সেই জমি তাদের দখলে বলে সমাধি দিতে বাধা সৃষ্টি করে।

ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরে আট বছর বয়সী শিশু আসিফা বানুকে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে রোমহর্ষক আখ্যায়িত করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস।
এ ঘটনায় দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, আমরা সবাই এই রোমহর্ষক ঘটনা গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছি। কর্তৃপক্ষের উচিত অপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক শুক্রবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেছেন।

আরেক খবরে প্রকাশ, জম্মুতে শিশু আসিফা বানুকে গণধর্ষণের পর নির্মম হত্যাকাণ্ডে চারদিকে সমালোচনার জোয়ার। গোটা দেশজুড়ে নানাভাবে দাবি উঠছে-ন্যায়বিচার চাই, দোষীদের ফাঁসি চাই। এমন পরিস্থিতির মধ্যে কোচি ব্রাঞ্চের কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাংকের এক কর্মী এই নির্মম ঘটনাকে সমর্থন করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন।

বিষ্ণু নন্দকুমার নামের এই ব্যাংককর্মী ফেসবুকে লেখেন, ‘আসিফা মারা গেছে ভাল হয়েছে। না হলে পরে ও-ই বোমা নিয়ে ভারতে হামলা করত।’ এরপর ওই ব্যাংকর্মী তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন। কোটাক মাহিন্দ্রার অফিসিয়াল পেজেও তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার দাবি ওঠে। বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে চাকরীচ্যুত করা হয়।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, নন্দকুমারের পরিবার বিজেপির সঙ্গে যুক্ত। তিনি আরএসএস-এর সমর্থনে প্রায়ই স্ট্যাটাস দেন।

কাঠুয়া গণধর্ষণ কাণ্ডে কাঠগড়ায় বিজেপি নেতারা। জম্মু–কাশ্মীরের দুই বিজেপি নেতা অভিযুক্তদের পাশে আছেন। এমনকি অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে তারা মিছিলেও অংশ নিয়েছেন। মুফতির মন্ত্রিসভার বিদেশ মন্ত্রী চৌধুরী লাল সিং ও শিল্প–বাণিজ্য মন্ত্রী চন্দরপ্রকাশ গঙ্গা হিন্দু একতা মঞ্চ আয়োজিত এই মিছিলে বুধবার পুরোদমে ছিলেন। দোষীদের নির্দোষ প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন দুই মন্ত্রী।

নারকীয় হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন মেহবুবা মুফতি। যার জেরে জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে বিজেপির। বুধবারই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন মেহবুবা। যেখানে কাশ্মীরের বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে একরাশ অভিযোগ জানিয়ে এসেছেন মুফতি। মেহবুবা বিরক্ত বিজেপি নেতারা অভিযুক্তদের পাশে দাঁড়ানোয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবারই রাজঘাটে অনশনে বসার কথা জানিয়েছেন দিল্লি মহিলা কমিশনের প্রধান স্বাতী মালিয়াল।

জম্মু-কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী মেহেবুবা মুফতি বলেছেন, ‘আমরা চাই না আর কোনো শিশু এরকম অসহ্য অত্যাচারের শিকার হোক। খুব শিগগিরি আমরা এমন আইন আনবো, যেখানে কোনো নাবালিকাকে ধর্ষণ করলে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়া হবে। এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে।’ নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত আসিফা শুধু সুবিচার পাবে তা নয়, তার হত্যাকারী এবং ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে বলেও জানান মেহেবুবা।

পাঁচ বছর আগে নির্ভয়া নামে একটি মেয়েকে গণধর্ষণের প্রতিবাদে ভারতে প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনে মুখে ধর্ষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল ভারতীয় সংসদ।

সর্বশেষ খবরের সূত্র অনুযায়ী, জম্মু-কাশ্মীরে ধর্ষণের পর খুন হওয়া আসিফার পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তদের পক্ষে বিজেপি নেতাদের বিক্ষোভ, জম্মু-কাশ্মীরের বার অ্যাসোসিয়েশন অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়ানো এবং চার্জশিটের বিরোধিতা করায় ভীত হয়ে তারা পালিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, আসিফার বাবা মুহাম্মদ ইউসুফ পুজওয়ালা তার স্ত্রী, দুই সন্তান এবং গবাদিপশু নিয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে চলে গেছেন অজানা কোনও ঠিকানায়।

গোল্লায় যাক ধর্ম আর রাজনীতি কিন্তু যাবেনা, আসিফারা ন্যায়বিচার না পেলে গোল্লায় যাবে সভ্যতা !

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − 9 =