মমতার নির্দেশে মূমূর্ষূদের জন্যে রক্তদান বন্ধ- বিপন্ন মানবতা

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

মুমূর্ষু রোগী রক্তের অভাবে মরলে মরুক! মান রাখতেই হবে নির্মল মাজির। তিনি বলেছেন, অতএব রক্ত নেওয়া যাবে না। কারণ, রক্তেরও ‘রং’ রয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিবেকানন্দ উড়ালপুল ভেঙে পড়ার পরে স্বাস্থ্য দফতরের কার্যত নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত, তৃণমূলের চিকিৎসক-বিধায়ক নির্মলের নির্দেশেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কের রক্তদান শিবির। কারণ সেই শিবিরের আয়োজন করেছিলেন বামপন্থীরা। নির্মলের পাশে থেকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়েছিলেন, অনেক রক্ত আছে। আর দরকার নেই।

অথচ বৃহস্পতি ও শুক্র— এই দু’দিনে শুধু মানিকতলার সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকেই উড়ালপুল দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জন গুরুতর আহতের পরিবার রক্ত না পেয়ে ফিরে গিয়েছেন বলে ওই ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মীরা জানিয়েছেন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ এবং আরজিকর মেডিক্যাল কলেজেও রক্ত না পেয়ে হাহাকারের ছবি প্রকট। মাড়োয়ারি রিলিফ সোসাইটির সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে বসে থেকেছেন আহতের পরিবারের লোকেরা। আর্জি একটাই, রক্ত চাই তাঁদের। সরকারি ডাক্তারদের অনেকেই হা-হুতাশ করে বলেছেন, এমনটা চলতে থাকলে স্রেফ রক্তের অভাবেই ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যু হতে পারে অনেকের।
কিন্তু নির্মল ও তাঁর নেত্রী ঘোষণা করে দিয়েছেন ‘রক্ত আছে’, তাঁর খেলাপ করে সাধ্য কার? তাই শুক্রবারও একের পর এক রক্তদান শিবির বাতিল করেছে বিভিন্ন সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক। স্বাস্থ্য দফতরের একটি সূত্রের খবর, এ দিন নির্মল মাজি শহরের অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ফোন করে হুমকি দেন, যাতে কেউ রক্তদান শিবির না করেন। সেই হুমকিতে গুটিয়ে গিয়েছে বেশির ভাগ ব্লাড ব্যাঙ্কই।
তারই মধ্যে একটি সংগঠন অবশ্য কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে রীতিমতো লুকিয়ে রক্তদান শিবির করেছে। সেই রক্ত গিয়েছে মেডিক্যালের ব্লাড ব্যাঙ্কেই। বিভিন্ন হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তাররাও সেই শিবিরে এসে রক্ত দিয়ে গিয়েছেন।

নির্মলকে তোয়াক্কা না করে ক্যাম্প হয়েছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
কত রক্ত এই মুহূর্তে সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কে মজুদ রয়েছে? যদি যথেষ্ট রক্ত মজুদই থাকে, তা হলে এত মানুষ রক্ত না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন কেন?

সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কের অধিকর্তা কুমারেশ হালদারকে এ প্রশ্ন করা হলে  তিনি এক ঘণ্টা পরে হিসেব দেবেন বলে জানান। এক ঘণ্টা পরে যোগাযোগ করা হলে অবশ্য বলে দেন, ‘‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের কোনও তথ্য দিতে নিষেধ করেছেন।’’

তথ্য না দিলে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে- এ  প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের কাছে অনেক রক্ত আছে। এর পরেও যাঁরা দিতে চাইছেন তাঁরা তাঁদের নাম, ফোন নম্বর দিয়ে যান। ভবিষ্যতে রক্তের দরকার পড়লে আমরা ডেকে পাঠাব।’’
মমতা শিষ্য নির্মল মাজির নির্দেশে রক্তদান শিবির বাতিল করার পর পশ্চিমবঙ্গের  স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন,” ব্লাড ব্যাঙ্কে এত রক্ত মজুত আছে যে, নতুন করে রক্ত সংরক্ষণ করে রাখার জায়গাই নেই! ”

কিন্তু রক্ত সঞ্চালন পর্ষদের কর্মকর্তারাই জানাচ্ছেন, মানিকতলার সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্ক হলো পূর্বাঞ্চলের মডেল ব্লাড ব্যাঙ্ক। এখানে সব সময়ে অন্তত পাঁচ হাজার ইউনিট রক্ত মজুত থাকার কথা।সব মিলিয়ে  যেখানে আড়াই হাজার ইউনিট রক্ত থাকার কথা,সেখানে বৃহস্পতিবার রাতে সব মিলিয়ে ছিল এক হাজার ইউনিটের মতো রক্ত।

যদিও এই ব্লাড ব্যাঙ্কে ব্যবস্থা রয়েছে এক সঙ্গে ১৫ হাজার ইউনিট রক্ত মজুত রাখার! শুক্রবারও কেন্দ্রীয় ব্লাড ব্যাঙ্কে হোল ব্লাড এবং রক্তের উপাদান মিলিয়ে ছিল ৮০৭ ইউনিট। অপরিস্রুত রক্ত ছিল ২১৫ ইউনিট। অর্থাৎ সেই হাজার ইউনিটের মতোই।
বৃহস্পতিবার সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কে আড়াইশোর বেশি রক্তদাতাকে ফেরত পাঠিয়ে দেন কর্তৃপক্ষ। তাঁদের বলা হয়, শুক্রবার দুপুরে রক্ত নেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী সেদিন ফের যখন তাঁরা জড়ো হন, তখন কর্তৃপক্ষ জানান, সংগ্রহে প্রচুর রক্ত আছে, আর দরকার নেই। এতে রক্তদাতারা বিক্ষোভ শুরু করলে চাপে পড়ে ৫০ জনের রক্ত নেয়া হয়। বাকিদের পাঠানো হয় অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজে।
কেন সকলের রক্ত নেওয়া হবে না? কুমারশেবাবুর জবাব, ‘‘এখন নেগেটিভ ছাড়া কিছু দরকার নেই, সেটাই নেব।’’

বাস্তবে দেখা গেলো ‘এ- নেগেটিভ ‘ ব্লাড গ্রুপ হওয়া সত্ত্বেও সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে ফেরানো হয়েছে সুশোভন চৌধুরী, তৃণা আহমেদ, শুক্লা সরকার, সুকান্ত হাজরা, প্রথম দত্ত সহ অনেককে।
কেন মডেল ব্লাড ব্যাঙ্ক হওয়া সত্ত্বেও সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত নেওয়া হবে না?  এ প্রশ্ন শুনে ফোন কেটে দেন রক্ত সঞ্চালন পরিষদের প্রধান ওঙ্কার সিংহ মীনা।

এ পরিস্থিতিতেও মমতার আরেক শিষ্য পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসচিব রাজেন্দ্র শুক্ল রক্ত না নেবার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ‘‘এটা তো আপদকালীন পরিস্থিতি নয়।’’
রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানবতাবাদী কর্মীদের প্রশ্ন, ‘‘এত মানুষ মারা গেলেন, আরও বহু মানুষ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। একে যদি আপৎকালীন পরিস্থিতি না বলা হয়, তা হলে কাকে বলা হবে?’’
ব্লাড ব্যাঙ্কের অধিকর্তা খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, অতিরিক্ত রক্ত নিলে তা ব্যবহার না করে ফেলে দিতে হবে। সেটাও কাম্য নয়।”

কত দিন রাখা যায় সংগৃহীত রক্ত? বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হোল ব্লাড ৩৫ দিন রাখা যায়। ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা ছ’মাস, প্লেটলেট পাঁচ থেকে ছ’দিন রাখা যায় । রক্ত দান করতে ইচ্ছুক মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হল কেন ? তাঁদের রক্ত সঞ্চয় করে রাখলে অন্তত এই গরম এবং ভোটের মরসুমে তো রক্তের আকাল থেকে খানিক রেহাই মিলত।
সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কের এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘বৃহস্পতিবারই নির্মলবাবু বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘সিপিএম ‘র দান করা রক্ত নিলে আর রক্ষা নেই।সুন্দরবনে বদলি হওয়ার চেয়ে রক্তদাতাদের ফিরিয়ে দেওয়া সহজ।’’
কী বলছেন নির্মল? তাঁর মন্তব্য, ‘‘যিশুখ্রিষ্টকে তো ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, সকলেই জানে। আমাকেও তাই করার চেষ্টা চলছে। ঈশ্বর এঁদের ক্ষমা করুন।’’

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seven + 19 =