”মর্মে মর্মে মানুষের স্বাধীনতা একটি বোধের উন্মোচন”- কবি বেলাল চৌধুরি

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

চার মাসেরও বেশি সময় ধরে কবি বেলাল চৌধুরী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়া হয়। এরপর শুক্রবার অবস্থার আরও অবনতি হলে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। তিনি ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, রক্তশূন্যতা, হাইপোথাইরোটিজ, ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন। তার অবস্থা আশংকাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা ।

জন্ম : ১২ নভেম্বর, ১৯৩৮, তিনি সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং সম্পাদক হিসাবেও খ্যাতিমান। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৪ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। এক সময় ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক সন্ধানী’ সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন, কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘকাল ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাস কর্তৃক প্রকাশিত ভারত বিচিত্রা পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সাহিত্যের সব শাখাতে তাঁর সদম্ভ পদচারণা থাকলেও বেলাল চৌধুরী মূলত কবি। মা-র মুখ থেকে শোনা ভারত চন্দ্র, হেম, মধু, নবীন সেনের কবিতায় মগ্ন হয়ে কৈশোরে বেলাল চৌধুরী রচনা করেন কবিতা ‘কত চেনা’। পঞ্চাশ দশকে সাপ্তাহিক ইত্তেহাদে প্রকাশিত এ কবিতার মাধ্যমে কবিতাঙ্গনে তাঁর যাত্রা শুরু। ষাটের দশকের ‘হাঙরি জেনারেশনের’ কবি বলা হয় তাকে।

”পুরনো বছরের নুড়িপাথরগুলো, একবার
আদ্যোপান্ত ঘেঁটে দেখলে কেমন হয়?
পরক্ষণে উঠবে না তো আবার তুমুল শোরগোল
ঘাঁটাঘাঁটি করে কীই-বা লাভ_
পরিত্যক্ত বর্জ্য নিয়ে কেউ কি আর মাথা ঘামায় তেমন
শুধু ছোট রানীরই নয় ঘুঁটেকুড়োনিরও দেমাক ভারী !
ওহে ভস্মলোচন চন্দ্রবদন, গুনতে হবে যে গাঁটের কড়ি”

তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : নিষাদ প্রদেশে (১৯৬৬), আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির জীবন ও নিসর্গ (১৯৭৬), স্বপ্ন বন্দী (১৯৮৫), জল বিষুবের পূর্ণিমা (১৯৮৫), প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি (১৯৮৭), যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে (১৯৯৭), বত্রিশ নম্বর (১৯৯৭), কবিতার কমল বনে, ভালোবাসার কবিতা (১৯৯৭), যে ধ্বনি চৈত্র, শিমুলে (২০০৮) সেলাই করা ছায়া (২০০৯) ইত্যাদি।

”কিন্তু কি আশ্চর্য একমুহূর্ত এলো এখানে
আমার জীবনে যা লিখা হয়ে গেল নির্দ্বিধায়
হৃদয়ের খাতায় রচিত হলো কাব্যগ্রন্থ অন্তরে
শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অনুভূত হল স্পন্দন”।

কবি বেলাল চৌধুরী তার এই জীবনে কলকাতা গিয়ে শ্মশানে ঘর ভাড়া করে কাটিয়েছেন। একদিন মাছ ধরার ট্রলারে চড়ে অজানায় পাড়ি দিয়েছেন, শক্তি, সুনীল, কমলকুমারের সাথে উত্তাল দিন কাটিয়েছেন ।

আড্ডা নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার এক চিলতে ”মজার ব্যাপার এই যে, ওখানকার অন্যতম তরুণ কবি বেলাল চৌধুরী কলকাতায় এসে আমাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন এইসব যুদ্ধের ডামাডোলের অনেক আগে থেকেই। এমনকি ‘৬৫ সালে যে একটি মূর্খের যুদ্ধ হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে, যখন যে-যাকে পারছে স্পাই বলে দেগে দিচ্ছে, এমনকি পরম শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মুজতবা আলিও এই আঁচ পেয়েছিলেন, তখনও কিন্তু বেলাল নিঃশঙ্ক চিত্তে, অম্লানবদনে আমাদের সঙ্গে নানান অভিযানে অংশ নিয়েছে”।

উল্লেখ্য, স্বৈরাচারী সেনাশাসক এরশাদের অবাঞ্ছিত কবিতা ও কবিশাসন ব্যবস্থার প্রতিবাদে ১৯৮৭ সালে কবি সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, ছড়াশিল্পী-সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, কবি বেলাল চৌধুরী  প্রমুখ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় কবিতা পরিষদ ।

এক সাক্ষাৎকারে সম্ভবত গত বছরে তাকে প্রশ্ন করা হয়, দেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে ভাবনা আসে ? বেলাল চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ”না, একদমই না। ঘরের বাইরের কোনো কিছুই আজকাল আমার মধ্যে রেখাপাত করে না। টেলিভিশন দেখি না। পত্রপত্রিকা পড়ি না। হঠাৎ একআধটু পড়ি”।

মৃত্যুচিন্তা আসে মাথায় ? কবি বলেছিলেন : হ্যাঁ, ভীষণভাবে আসে। তবে আগেও মৃত্যুর কথা ভাবতাম। এখনকার মৃত্যুচিন্তা একটু অন্যরকম। মনে হয় অনিবার্য আমি মারা যাবো। প্রশ্ন ছিল, যৌবনের মৃত্যুচিন্তাটা কেমন ছিল ? কবির উত্তর : যৌবনে সত্যি বলতে এসব চিন্তা কখনো মাথায়ই আসতো না।

”আছি আমি ব্যপ্ত হয়ে তোমার রৌদ্র ছায়ায়
এইতো তোমার ঘামে গন্ধে তোমারই পাশাপাশি,
তোমার ছায়ার মতো তোমার শরীর জুড়ে প্রাণের আরাম_
তোমার নদীর কুলুকুলু স্রোতের দোলায়;
তোমার যেমন ইচ্ছে আছি আমি_
ঝিরিঝিরি পাতার ভেতর হাওয়ার ঝড় উথাল পাতাল
রাত্রি দিন তোমার ধানের ক্ষেতের হিল্লোলিত সবুজ প্রাণের বন্যায়
যায় ভেসে যায় উদাসী বাউল, যায় ভেসে যায় ভাটিয়ালি গান
কোন নিরুদ্দেশে আছি আমি
বেলা শেষের রোদের মতন
গড়িয়ে তোমার পায়ে পায়ে ঝরিয়ে রঙের ফোটা
আছি তোমার ধানের দুধে, মঞ্জুরিত
তোমার আঁচল ছোঁয়া নিলাম্বরি মেঘের ভেলায়
আছি আমি এইতো তোমার নাকছাবিটির মুক্তো যেমন
জ্বলছে কেবল জ্বলছে কেবল…”

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 × 1 =