হিরোশিমা, নাগাসাকি ধ্বংসযজ্ঞকে হার মানিয়েছে একাত্তরের গণহত্যা:কিশোরগঞ্জের ৪ রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

১৯৭১ সালের ১৬ জুন নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রবন্ধে বলা হয়, ‘হিরোশিমা, নাগাসাকি, হামবার্গ, ড্রেসডেনের সেসব ধ্বংসযজ্ঞকে ভুলিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ঘটিয়েছে।’ সেই উদাহরণ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘোষণা করলেন কিশোরগঞ্জের রাজাকার ঘাতকদের মৃত্যুদন্ডের রায়  ।

করিমগঞ্জের রাজাকাররা ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত  ১৪ জনকে হত্যা করে।

রায়ে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, একাত্তরের গণহত্যা ছিল ভয়ংকর অপরাধ। এসব অপরাধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে রাজাকার, আলবদর বাহিনীর স্থানীয় সদস্যরা। কিশোরগঞ্জের এই পাঁচ রাজাকারের ধ্বংসযজ্ঞও ভয়াবহ ছিল। তাদের কর্মকাণ্ড ছিল ভয়ংকর। স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে, মানবতার বিরুদ্ধে তাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। অপরাধের ভয়াবহতা তাদের কুখ্যাত মানুষ হিসেবে প্রমাণ করে। এই বিবেচনায় তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তিই পাওনা।

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতা-বিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কিশোরগঞ্জের শামসুদ্দিন আহমেদসহ চার রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে এই প্রথম এক মামলায় চারজনকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হলো। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। 

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন শামসুদ্দিনের সহোদর রাজাকার নাসিরউদ্দিন আহমেদ, রাজাকার কমান্ডার গাজী আব্দুল মান্নান ও রাজাকার হাফিজ উদ্দিন।

মামলার অন্য আসামি রাজাকার আজহারুল ইসলামকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শামসুদ্দিন ছাড়া অন্যরা পলাতক। বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী।

তবে কারাবন্দি আসামি শামসুদ্দিন ৩০ দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

পলাতকরা আপিল করতে চাইলে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেপ্তার করার ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতেও বলা হয় রায়ে।

পাঁচজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা সাত অভিযোগের সব ক’টিই প্রমাণিত হয়েছে। তবে চারটি অভিযোগে আলাদাভাবে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আবার ভিন্ন অভিযোগে আসামিদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একটি অভিযোগে একজনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে অন্য শাস্তি কার্যকর হবে না বলে রায়ে বলা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, ‘এ কথা সত্য যে স্থানীয় রাজাকাররা একাত্তরে হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ, ধর্মান্তকরণ, অপহরণ, নির্যাতনের মতো ভয়ংকর সব অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। পাকিস্তানের দোসর হিসেবে তাঁরা এমন কোনো ভয়ংকর অপরাধ নেই যা করেনি। স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার করেছেন তাঁরা।

পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করতে মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত হয় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী। কেন্দ্রীয় নির্দেশ পালন করে মাঠপর্যায়ের রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী। দণ্ডপ্রাপ্ত এই পাঁচজন ছিলেন রাজাকার। তাঁরা স্থানীয় রাজাকার নেতা ছিলেন। স্থানীয় রাজাকাররা এমনই ধ্বংসাত্মক কাজ করেছেন, যা জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞকেও হার মানায়।

১১ এপ্রিল এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। পরে গত সোমবার রায় ঘোষণার জন্য ৩ মে তারিখ ধার্য করা হয়।

গত বছরের ১৩ মে কিশোরগঞ্জের এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুট, অপহরণ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ।

অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৭ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের বিদ্যানগর ও আইলা গ্রামে নাসিরউদ্দিন ও শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী আবদুল বারেক, মো. হাবিবুল্লাহ, শেখ চান্দু মিয়া, শেখ মালেক, আফতাব উদ্দিন, সিরাজ উদ্দিন, আবদুল জব্বার ও আবদুল মজিদকে গুলি করে হত্যা করে। ১১ নভেম্বর নাসিরের নেতৃত্বে রাজাকাররা আইলা গ্রামে লুট ও নির্যাতন চালায় এবং মিয়া হোসেনকে হত্যা করে।

৭ সেপ্টেম্বর রামনগর গ্রামে শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে রাজাকাররা তাঁরই সহপাঠী পরেশ চন্দ্র সরকারকে আটক করে নির্যাতন ও হত্যা করে। করিমগঞ্জ থানার বিদ্যানগর ও আইলা গ্রামে আটজনকে হত্যার অভিযোগে শামসুদ্দিন, নাসিরউদ্দিন ও মান্নানের মৃত্যুদণ্ড এবং আজহারুল ইসলাম ও হাফিজের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে।

আইলা গ্রামে মিয়া হোসেনকে হত্যার অভিযোগে নাসিরুদ্দিন আহমেদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। করিমগঞ্জ থানার মো. গফুরকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে গাজী মো. মান্নান ছাড়া বাকি চারজন দোষী প্রমাণিত হন। এতে হাফিজের মৃত্যুদণ্ড এবং শামসুদ্দিন, নাসিরউদ্দিন ও আজহারের আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়েছে। মান্নান খালাস।

করিমগঞ্জ ডাকবাংলোতে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে মো. ফজলুর রহমানকে অপহরণ করে হত্যার অভিযোগে পাঁচজনই দোষী সাব্যস্ত। প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রামনগর গ্রামে পরশ চন্দ্র সরকারকে হত্যার দায়ে শামসুদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পূর্ব নবাইদ কালিপুর গ্রামে আবু বকর সিদ্দিক ও রুপালি মিয়াকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে গাজী মো. মান্নানকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আতকাপাড়া গ্রামে হামলা চালিয়ে ২০-২৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে গাজী মান্নানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল গতকাল সকাল পৌনে ১১টায় ৩৩০ পৃষ্ঠা রায়ের সারাংশ পড়া শুরু করে শেষ করেন দুপুর সাড়ে ১২টায়। তিন ভাগে তিন বিচারপতি রায় পড়ে শোনান।

রায় ঘোষণার সময় আসামি শামসুদ্দিন আহমেদ কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সকাল ৯টায় ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে শামসুদ্দিন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবেন বলে তাঁর আইনজীবী মাসুদ রানা জানান।

পলাতক চারজনের পক্ষে সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান বলেন, ওই চারজন আত্মসমর্পণ করে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে খালাস পাবেন।

অন্যদিকে এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনা সাত অভিযোগের সবগুলোই প্রমাণিত হওয়ায় এবং আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ ও রেজিয়া সুলতানা।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য শামসুদ্দিন আহমেদের বাড়ি করিমগঞ্জ উপজেলার করিমগঞ্জ মধ্যপাড়া (ডুলিপাড়া) গ্রামে। একাত্তরে তিনি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে করিমগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় অপরাধে লিপ্ত হন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেশ কিছুদিন পলাতক থেকে আবারও ফিরে আসেন। শামসুদ্দিনের বড় ভাই নাসিরউদ্দিন আহমেদ একাত্তরে যোগ দেন রাজাকার বাহিনীতে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, দুই ভাই সেই সময় রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নানের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেন। নাসিরও স্বাধীনতার পর আত্মগোপনে যান। পরে একসময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এ কারণে এলাকার মানুষ তাঁকে ক্যাপ্টেন নাসির নামেও চেনে। করিমগঞ্জের চরপাড়া গ্রামের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া গাজী আবদুল মান্নানই একাত্তরে স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হন। খুদির জঙ্গল গ্রামের হাফিজউদ্দিন লেখাপড়া করেছেন মাদ্রাসায়। হাইধনখালি গ্রামের আজহারুল ইসলামও মাদ্রাসায় পড়েছেন এবং একাত্তরে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন।

আমাদের কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি শফিক আদনান জানান, পরেশ চন্দ্র সরকার ছিলেন রাজাকার শামসুদ্দিন আহমেদের সহপাঠী। ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সকালে  বিনা কারণে সবজি ক্ষেতে গিয়ে এই সহপাঠী বন্ধুকেই গুলি করে হত্যা করেন শামসুদ্দিন আহমেদ। শুধু তাই নয়, হত্যার পর নির্দেশ দিয়ে যান, তাঁর লাশ মাটিচাপা দিতে, কেউ যেন দাহ করার চেষ্টা না করে। এলাকাবাসী ভয়ে ওই নির্দেশই পালন করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর  এলাকাবাসী পরেশের লাশ গর্ত থেকে তুলে হিন্দু ধর্মমতে দাহ করে।

রাজাকার নাসির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন আরো নিষ্ঠুর । যে গ্রামে তিনি থাকতেন সেই গ্রামে তাঁর নেতৃত্বে রাজাকাররা এক দিনে আটজন নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

হত্যার শিকার পরেশের বন্ধু গুজাদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রাশিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘বহু বছর পরে হলেও  রাজাকার বাহিনীর এমন নৃশংস হত্যাকান্ডের বিচার হওয়ায় আমরা খুশি।’

করিমগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মেহেদি উল আলম জানান, বহু বছর পার হয়ে গেলেও এখানকার মানুষ এখনো ভোলেনি রাজাকার মান্নান, নাসির ও শামসুদ্দিনের নৃশংসতার কথা। দেরিতে হলেও মানবতাবিরোধী বিচার শেষ হওয়ায় এলাকাবাসী খুশি হয়েছে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

four × five =