মামাবাহিনী প্রধান সৈয়দ শহীদূল হক মামার জীবনাবসান

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

 

বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় বিদায় জানাই তাকে, যিনি অনেকের কাছে শহীদ, অনেকের কাছে শহিদুল ভাই, অনেকের কাছে শহিদুল মামা বলে পরিচিত, আজকের প্রজন্মের কাছে যিনি বুকভরা প্রেরণা ।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কাদেরীয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী ও মামা বাহিনী নামে যে বাহিনী ছিল, সেই মামা বাহিনীর প্রধান ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ শহীদূল হক মামা। রণাঙ্গনের ২ নম্বর সেক্টরের মেলাঘর ইউনিটের প্রধাণ এই বীর সেনানী নিজের জীবন বাজি রেখে অতুলনীয় পরাক্রমের সাথে আত্মসমর্পণ না করা স্বাধীনতার শত্রু বিহারিদের দখলে থাকা দুর্ভেদ্য ঘাঁটি মিরপুর মুক্ত করেন ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। এ এক অসামান্য বীরত্ব গাঁথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অধ্যায়।

চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি বাংলাদেশ থেকে ২৮ এপ্রিল কাতার এয়ারোয়েজে সুইডেনের পথে রওয়ানা হন। দীর্ঘদিন যাবত নানা জটিল রোগে ভুগতে থাকা এই বীর বিমানে অসুস্থ হয়ে পড়লে ২৯ এপ্রিল তাকে দোহার একটি বিশেষ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার অবস্থার অবনতি হতে থাকলে তাকে ৩ মে ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে নিয়ে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। খবর পেয়ে স্টকহোল্ম থেকে তার অসুস্থ স্ত্রী, একমাত্র ছেলে খালেদ (ছোট ছেল সামি ১৬ বছর বয়সে ২০০৬ সালে ক্যান্সারে মারা যায়) ও মেয়ে শায়লা দোহা রওয়ানা হন এবং তারা সেখানেই অবস্থান করেন । একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, স্টকহোল্ম ও কাতারের বাংলাদেশ দুতাবাস তার চিকিৎসা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।

সুইডেনে বসবাসরত শহিদুল হক কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতা অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন এছাড়াও যুদ্ধাপরাধী ফাঁসির দাবীতে শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। । মিরপুরে কাদের মোল্লা ও বিহারীদের নির্মম ধ্বংসলীলা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। এছাড়াও তিনি ৬৬ -তে ছয় দফা , ৬৯-তে গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি জড়িত ছিলেন। মিরপুর তিনিই বিহারীদের সামনে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন সাহসের সঙ্গে। ২০১৩ তে তার একটি সংগৃহিত সাক্ষাৎকার নিচে দেয়া হলো :

”একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ডাক এবং এর আগের ঘটনা গুলো সম্পর্কে যদি না বলি তাহলে মিরপুরের সঠিক চিত্রটা আসবে না। এই যে জল্লাদ কাদের মোল্লা, এই যে জামাতী ইসলামী, ইসলামী ছাত্র সংঘ, মুসলীমলীগ, কনভেনশন মুসলীমলীগ এবং বিহারীরা এরা যে দুর্গ এখানে তৈরি করেছে। কারণ তারা মনে করত মিরপুর তাদের আবাসভূমি এবং এটা মুহাজিরের এলাকা। হাতে গোনা কয়েক শ বাঙালি থাকত কলোনির ভেতরে। এটা কল্পনাই করা যায় না; পানি তে থেকে কুমিরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

১৯৬০ দশকে আমরা যখন এখানে (মিরপুর) করা শুরু করি, ৬২ তে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, ৬৬ সনে ছয় দফা, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের এগার দফা আর তখন থেকেই তাদের সাথে আমাদের লড়াই শুরু হয়ে গেল। তারা ছয় দফা ও এগার দফার বিপক্ষে প্রাচীর তৈরি করল। পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে বাঘ বলে পরিচিত; খান আবদুল কাইয়ুম খানকে, এই জামাতী ইসলাম আর এই বিহারী মুহাজিররা তাতে ওখান থেকে দাওয়াত করে নিয়ে আসল ছয়দফা ও এগার দফার বিপক্ষে কথা বলার জন্য।

যখন আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ করলাম এটার আহবায়ক আমি ছিলাম। আমাদের সাথী বন্ধুরা মিলে আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করলাম। কাইয়ুম খান আসল বর্তমান যে ক্রিকেট মাঠ তখন তা এমনি মাঠ ছিল সে জায়গায়। সে তার ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বলে- “ শেখ মুজিবুর গাদ্দার হে, পাকিস্তানকা দুশমন হে”!

একথা শোনার পর আমরা আর বিলম্ব না করে প্রাণের মায়া ত্যাগর করে ঝাঁপিয়ে পড়লাম স্টেজে। তাদের এতো বড় সাহস! যখন গণঅভ্যুত্থান, সারা পৃথিবীর পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর খবর পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে আর তখন কিনা সে এই কথা বলে। ঝাঁপিয়ে পড়ার পর আমাদের উপর হামলা শুরু হল; গণপিটুনি আর গণধোলাই। আমার সাথে ছিল খুন সুনাম ধন্য আমার বিশিষ্ট বন্ধু যারা সাথে আমি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি তার নাম এডভোকেট শাহ আলম।

এই মিরপুরেই তাদের বাড়ি ছিল। শহীদ স্মৃতি স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সে ছিল এবং গভর্নিং বোর্ডের মেম্বারও সে ছিল। আমাদের সাথে সাথে হায়দার, জিল্লুর, কাশেম,হাশেম কেউ বাদ নেই কিন্তু আমাকে আর আমিনকে পিটাতে পিটাতে মেরে ফেলছিল। আমিনকে ডাস্টবিনে ফেলে দিল; ভেবেছিল সে মারা গেছে। আর আমাকে নিয়ে গেল থানায়। ফেন খুলে যে হারে পিটিয়েছে আর কী বলব। একেকটা বাড়ি মেরে বলে জয় বাঙলা আর বলবি? কিন্তু আমি তারপরেও বলি “জয় বাঙলা”।

এই যে এতো অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে তারপরেও এদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে সংগ্রাম করে গেছি। ৭০-এ নির্বাচনে এই এলাকা থেকে কুখ্যাত গোলাম আযম নির্বাচন করেছিল। মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও তেজগাঁও এক অংশ নিয়ে এই নির্বাচন হয়। গোলাম আযম দাড়ি-পাল্লা নিয়ে এই নির্বাচন করেছিল। আর গোলাম আযমের সেক্রেটারি ছিল কাদের মোল্লা।

তার পক্ষ হয়ে এই কাদের মোল্লা নির্বাচনী প্রচার অভিযান চালিয়েছিল। আর আমরা জীবনের বাজি রেখে বঙ্গবন্ধুর আপন জন; এডভোকেট জহির উদ্দিন তাকে মেম্বার অব ন্যাশনাল এসেম্বলির প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হল আর প্রভিশনাল এসেম্বলির প্রার্থী হিসেবে দেওয়া হল মোশারফ হোসেন কে। আমরা দুইজনকেই নির্বাচনে জয়ী করিয়ে বিজয়ীর মুকুট পড়ালাম। আর এই হারের প্রতিহিংসা বিহারীরা ও আমাদের শত্রুরা মনে পুষে রেখেছিল। তারা প্রকাশ করেনি শুধু অপেক্ষা করেছিল এর প্রতিশোধ নেবার জন্য।

২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে সারা দেশে অপারেশন সার্চ লাইট কে কেন্দ্র করে যে পৈশাচিক খুন-খারাবি ও ধ্বংসলীলা শুরু হয়েছিল মিরপুর এর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। এই কাদের মোল্লাকে দেখেছিলাম সে আনন্দে আত্মহারা। সে বিহারীদেরকে নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, বাড়ি বাড়ি আগুন লাগাচ্ছে। সে চিৎকার করে বলছে, হুংকার করে বলছে “ কাহা তেরা বাংলাদেশ ? দেখ এবারো তামাশা দেখ ধামাকা দেখ”

এই যে পাগলের মতন খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাদেরকে। আমরাই তখন নৌকার প্রতীক নিয়ে ছিলাম, আমরাই তখন বাঙালির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলাম। কিন্তু তখন আমি ৭১-এর রণাঙ্গনে চলে গেলাম। আমার মনে এতো ব্যথা এতো বেদনা এতো কষ্ট ছিল কারণ আমি লাশের উপর পাড়ি দিয়ে গেলাম। আমাকে ধরার জন্য তারা আমার পেছন পেছন ছুটছিল।

কাদের মোল্লা আর বিহারীরা আমার পেছনে ছুটছে আর বলছে “পাকড়াও পাকড়াও শহিদ আয়া”। আমি প্রাণ পণে ছুপে বেড়াচ্ছি আর তারা চতুর্দিকে গুলি করছে। আর এই অবস্থা দেখে পশু-পাখিও দৌড়চ্ছে, রাস্তার কুকুর গুলো পর্যন্ত দৌড়চ্ছে জান বাঁচাবার জন্য।

আজকে দেশ স্বাধীন হল। নিরানব্বই হাজারের মতন খান সেনারা এই জল্লাদরা আত্মসমর্পণ করল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কিন্তু স্বাধীনতার পরও মিরপুর ছিল ব্যতিক্রম। এরা পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে রেখেছিল। আমাদের প্রতি এদের একটা প্রতিহিংসা ছিল আগ থেকেই। তার এক নাম্বার কারণটি হল; আমি ২৩শে মার্চ পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে ফেলি এবং বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালাম। যেটাতে মানচিত্র আঁকা ছিল।

এখন আমার নিজেকেও নিজের বিশ্বাস হয় না আমি কোন সাহসে ঐ উপড়ে উঠেছিলাম। তুঙ্গে উঠে পাকিস্তানী পতাকা ফেলে দিয়ে আমাদের স্বাধীন বাঙলার পতাকা ওড়ালাম। আমার সাথে যে সমস্ত সহকর্মী ও সাথী ছিল তারাও ভীতু ছিল না। তারা আমাকে সহযোগিতা করেছিল এই পতাকা উড়াবার জন্য। আর হাজার হাজার বিহারী তামাশা দেখছিল; এই ২৩-শে মার্চে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে দিয়ে এই বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালাম।

আজকে আমার এই দেশ যা ত্রিশ লক্ষের জীবনের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। আর এই হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে ঘাপটি মেরে বসেছিল এই মিরপুরে। আমরা পালাক্রমে মিরপুর আসছিলাম ইনভেস্টিগেশন করার জন্য কার এতো বড় সাহস যে কিনা পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়ে রেখেছে। আমার সাথে অনেকের কথা হল তারা বলছে- না হামারা বাংলাদেশ বানায়া, ইনকো দোবারা পাকিস্তান বানায়েগা। এই যে তাদের এতো দম্ভ কারণ তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র মজুদ ছিল। কিন্তু আমরা তখন তা বুঝতে পারি নি।

আমি যখন এক থেকে ১১ নাম্বার ১২ নাম্বার ঘুরে এই ইদগাও কাছে আসার সাথে সাথে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু হয়ে গেল। আমি যে জিপে ছিলাম তা উল্টে যায়। ওখানে আগ থেকেই বাঙ্কার ছিল। আমরাও তাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করে দিই কারণ আমাদের কাছেও অস্ত্র ছিল। কিন্তু আমরা টিকতে পারলাম না। সে যুদ্ধে রফিক মারা গেল। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসে সাংবাদিকদের বলেছিলেন- আর শহিদ নয় এবার গাজী হয়ে বাঁচব।

এই রফিকের লাশ নিয়ে গেলাম গণভবনে। খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু ছুটে আসলেন। বঙ্গবন্ধু আশ্চর্য হয়ে গেলেন। আমরা তখন বললাম- আমরা রফিকের মা কে কী জবাব দেব? আপনি বলেছিলেন; আর শহিদ নয় এবার গাজী হয়ে বাঁচব।

উনি তখন ঘাবড়িয়ে গিয়ে সেনা বাহিনীর প্রধানকে খবর দিলেন সাথে খালেক মোশারফকেও খবর দিলেন। এবং আদেশ করলেন যতদ্রুত সম্ভব মিরপুর মুক্ত কর। কিন্তু কী দেখলাম! এদের যে দুর্গ এদের যে অস্ত্র-শস্ত্র। এদের কাছে মনে হয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিন কোম্পানি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আর অসংখ্য বাঙালিরা আনন্দ উল্লাসে মিরপুরে ঢুকেছিল তারা প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারে নি। তাদের শরীরের এক টুকরা মাংস পর্যন্ত আনা সম্ভব হয় নি।

এই মিরপুর ৩১ জানুয়ারি মুক্ত হল। এখন প্রশ্ন; এই স্বাধীন বাঙলার মাটিতে এই জহির রায়হানকে জীবন দিতে হল, এখানে জীবন দিতে হল লেফট্যানেন্ট সেলিমকে এছাড়াও অসংখ্য বাঙালি পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। বাবা-মা, ভাই-বোনকে সবাইকে টুকরা টুকরা করল।

তোরাব আলীর মায়ের বয়স ছিল ৯০ বছর এই পরিবারকেও নির্মমভাবে খুন করেছে। বাড়ি বাড়িতে গিয়ে তারা খুন করেছে। আমাদের বন্ধু মতিউর রহমানকে কসাইয়ের খাটে রেখে টুকরা টুকরা করেছে। মতিন চৌধুরীর এক আত্মীয় সে পাগল ছিল তাকেও বাদ দেয় নি তারা। তাকেও টুকরা টুকরা করেছে। ডেকোরেটর নুর হোসেন যে কিনা সত্তরে বিশাল নৌকা উপহার দিয়েছিল পেন্ডেল করে। তারা তার শ্বশুরকে জবাই করল তার শালাকেও জবাই করল।

আজকের ট্রাইব্যুনালে আমি বিবেকের তাড়নায় সাক্ষী দিলাম। আমি সাক্ষী দেওয়ার সময়ও আঘাত প্রাপ্ত হলাম যাতে আমি সাক্ষী দিতে না পারি। আমার পা দিয়ে রক্ত ঝরছে তারপরও আমি আদালতে আসলাম সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য।

এই যে পাশেই কিশোরগঞ্জ মেডিক্যাল সেন্টার সেখানে আপনারা জিজ্ঞেস করতে পারেন সেখানে ডাক্তার আমাকে বার বার সর্তক করে দিচ্ছে যে; আপনার দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া উচিত তা না হলে আপনাকে বাঁচানো যাবে না, আপনার পা কেটে ফেলতে হতে পারে। আপনি ডায়াবেটিসের রোগী । সাক্ষ্য শেয় হওয়ার পর, জেরা শেষ হবার সাথে সাথে ঐ রাতেই আমি সুইজারল্যান্ডে চলে গেলাম আর ওখানেই চিকিৎসা করালাম।

এই যে বিশাল মিরপুর; এটার একটি অংশের ইনভেস্টিগেশন হল কিন্তু আরেক অংশেও যে হত্যা হল কিন্তু ট্রাইব্যুনালে ঐ অংশকে উপেক্ষা করে কেন যে তার তদন্ত শেষ করল তা আমার বোধে আসে নি।

তোরাব আলীর বাসা ছিল আমার আগের বাসা থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। তোরাব আলীর পরিবার ছিল একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ছিল তা মিরপুরের সবাই জানত। আমি বিনীত ভাবে বলে আসছিলাম তোরাব আলীর ছেলে যে কিনা তখন ছোট ছিল কিন্তু এখন সে তার পরিবার হত্যার বিচার চায়।

কিন্তু কোন অদৃশ্যের হাতের কারণে তাকে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী করা হল না তা আমার জানা নেই। এই জবাব কে দেবে? কেরানীগঞ্জে এই মামলার কন্টিনিউশন দরকার ছিল না। সমগ্র মিরপুরে কাদের মোল্লা জল্লাদের হত্যা-লীলা, হাক্কা গুণ্ডা, হাশেম, হাশমির, নেহাল, হাশেম চেয়ারম্যান এই যে আব্বাসরা যে তাণ্ডব চালাল কিন্তু আজকে দুঃখ হয় তাই বিবেকের তাড়নায় সাক্ষী দিয়ে গেলাম, দৃঢ়তর সাথে দিয়ে গেলাম, সাহসের সাথে দিয়ে গেলাম এই সাক্ষ্য। তাদের কোন এডভোকেট আমাকে কাবু করতে পারে নি।

বর্তমান ট্রাইব্যুনাল আমাদের জনগণের দাবী ছিল। গত নির্বাচনে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা জয়ী হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। সেই ধারাবাহিকতায় এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হল এবং এই ট্রাইব্যুনালে আমি কাদের মোল্লা বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়ে দিলাম এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এই খুন-খারাবি, হত্যা, নির্যাতন, অগ্নি সংযোগ যা দেখেছিলাম তাই আমি বিজ্ঞ বিচারপতিদের কাছে উপস্থাপন করি। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো ছিল- হত্যা, লণ্ঠন, ধর্ষণ, ভয়-ভীতি সকল অভিযোগই ছিল এই কসাই মোল্লা বিরুদ্ধে।

আন্তর্জাতিক মানবতা-বিরোধী ট্রাইব্যুনালে আমি যে সাক্ষ্য দিলাম রাষ্ট্র-পক্ষের পক্ষ হয়ে। তার যত খুন হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, ভয়-ভীতি সব কিছুই দেখেছি সত্তরের নির্বাচন থেকে এবং দৃঢ়তর সাথে সাহসের সাথে আমি আদালতকে সব কিছু বলেছি।

আমি মিডিয়ার কাছে বলেছি- পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসির হুকুম ছিল। সে অস্ত্র দিয়ে কাউকে গুলি করে নি। সে হুকুমের আসামী হয়েছিল। আর সেই হিসেবেই তার শাস্তি হল। অন্য দিকে জল্লাদ কাদের মোল্লার এতো হত্যা লুণ্ঠন, কবি মেহেরুন্নেসা থেকে শুরু করে বাঙলা কলেজের ছাত্র শহিদ পল্লব (টুনটুনি) যে ছিলেটি আমাদের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে মিছিলে ছিল তাকেও হত্যা করা হল নির্মম পৈশাচিক ভাবে। তার আঙুল গুলো কেটে দিল হত্যার পর গাছে ঝুলাল। এতো কিছুর পরও কীভাবে আর কী কথা বললে এই কাদের মোল্লার ফাঁসি হতো।

কাদের মোল্লারা,  রাজাকার, আলবদর, জামাতী ইসলামী ও বদর বাহিনীদের গেজেট নটিফিকেশনের মাধ্যমে পাকিস্তানী সেনা বাহিনীতে যোগ করে নেওয়া হয়েছে। এই কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামীরা পাকিস্তানী খান সেনাদের মতন- রেশন, খাদ্য, চিকিৎসা যা ছিল সবাই কিন্তু তারাও ভোগ করেছিল গেজেট নটিফিকেশনের মাধ্যমে। এই জিনিসটাও তো বলা উচিত ছিল আমাদের রাষ্ট্র-পক্ষের উকিলদের। এটাও তো একটা দলিল।

সংবিধানে জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, কনভেনশন মুসলীমলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, কাউন্সিল মুসলিম দল সহ সকল বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর এই জিয়াউর রহমান ক্ষমতার মতলবে এসে এদেরকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে দেয়। ৭

৩-এ যেসব যুদ্ধাপরাধী বন্দি ছিল তাদেরকে রাজবন্দী হিসেবে মুক্ত-জীবনে ফিরিয়ে আনলেন। তাদের রাজনৈতিক সংগঠন যেটা নিষিদ্ধ ছিল তাদেরকেও রাজনীতি করার অনুমতি দিয়ে দিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় হত্যার পর হত্যা, খুন-খারাবি শুরু হয়েছিল যেসব মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা হারিয়েছি, যারা নামী দামী, যারা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিল, যারা বিভিন্ন সেক্টর কমান্ডার ছিল, যারা বীর উত্তম খেতাব নিয়ে ভূষিত তাদেরকে পালাক্রমে হত্যা করা হয়।

এই যে কিবরিয়া সাহেব; যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের একজন বিজ্ঞ কূটনৈতিক ছিলেন। যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নিউ ইয়র্কে জন হ্যারিসনের সাথে কাজ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাহায্য করার জন্য। এই স্বাধীন বাঙলার মাটিতে তাকে গ্রেনেড মেরে হত্যা করল। আজ পর্যন্ত আসামীদেরকে শনাক্ত করা হল না, গ্রেফতার করা হল না। তা নিয়ে নাটক চলছে। আমাদের বাঙলা একাডেমিতে ড.হুমায়ুন আজাদকে আঘাত করা হল। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গিয়েও তাকে ডিজিটাল একশনের কারণে তাকে জীবন দিতে হল প্রবাসে।

একুশে আগস্টে বোমা বাজি করল, এতো গুলো গ্রেনেড ছুড়ে মারল। এমনকি গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা এতে সরাসরি জড়িত ছিল- ডি.জি.এফ.আই, এন.এস.আই, স্পেশাল ব্রাঞ্চ। এরাই প্রোটেকশন দিয়ে গ্রেনেড গুলো এখানে ছুড়ে মারল। এতে কারা জীবন দিল? এই আমাদের স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির সৈনিকরা। এখন আমার কথা হচ্ছে; আর কতো লাশ পড়লে সরকারের টনক নড়বে আর কবে জামাত-শিবিরের রাজনীতি বাতিল করবে? এটাই আমার  প্রশ্ন।

তবে আমার মাঝে মাঝে দুঃখ হয়। এই শাহবাগ সম্পর্কে ব্যারিস্টার রফিকুল হক সাহেব যে উক্তি করেছেন তিনি কী ভুলে গেছেন; এই মিরপুরে তার ভাইকে জবাই করেছিল বিহারীরা? হয়তো তিনি ভুলে যেতে পারেন। যদি বিবেকের তাড়নায় জল্লাদের বিপক্ষে ভলান্টিয়ার হিসেবে যদি দাঁড়াতেন কারণ তার ভাইও এই মিরপুরে জীবন দিয়েছেন। তাই বিজ্ঞ আইনজীবী হিসেবে তিনি ভলান্টিয়ার হিসেবে সার্ভিস দিতে পারতেন। হয়তো তিনি ভুলে গেছেন। আপন ভাই হোক চাচাত ভাই হোক আপনারা জিজ্ঞেস করেন কেউ কী বিহারীদের জীবন দিয়েছিল কিনা?

এই যে বাচ্চু রাজাকার পালিয়ে গেল চিন্তা করতে পারেন। আমার প্রশাসন কোথায় ছিল? কোথায় ছিল আমাদের হোম মিনিস্ট্রি? কোথায় ছিল আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ? কেউ নজর রাখে নাই। তিনি ভি.ভি.আই.পি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গেলেন। শত্রু আমাদের মাঝেই আছে প্রতিক্ষণে আমার সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

আমাদেরকে যদি ঢাকার অপারেশনে না পাঠাত তাহলে এই কুখ্যাত মোনেম খানকে কেউ মারতে পারত না। মোনেম খানের কোন অকস্মাৎ মৃত্যু হয় নাই। আমরা গেরিলারা তাকে হত্যা করি। এছাড়া আরও অনেক জল্লাদকে আমরা হত্যা করি। হোটেল ইন্টারনেশেনাল ইন্টার কন্টিনেন্টাল এখানে বিস্ফোরণের শব্দে পৃথিবীকে জানান দিল যে গেরিলা ওয়ার স্টাটিং”।

 

(কৃতজ্ঞতা প্রকাশ- সুব্রত শুভ, ফড়িং ক্যামেলিয়া,রুদ্র সাইফুল)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eleven + 13 =