যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা রাজাকার সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

মানুষের আশা পূর্ণ হয়নি, রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বহাল চেয়েছিল, সেটাও কার্যকর হয়নি। তবে, আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনে খালাস চেয়েছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদীর সে দুরাশা সৌভাগ্যবশত   কার্যকর হয়নি ।

রিভিউ শুনানিকালে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বেঞ্চের বিচারপতিদের সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ আপনারা যেদিন থাকবেন না আপনাদের খুব ‘ফিল’ করবো। তখন প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘শুনুন মি: অ্যাটর্নি জেনারেল; রাষ্ট্রের কাছে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান বড়। আমরা যেদিন থাকব না সেদিনও রাষ্ট্র চলবে, দেশ চলবে।’

রবি ও সোমবার শুনানি করে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ দুটি রিভিউ আবেদনই খারিজ করে দিয়েছে।অন্য চার বিচারপতি হলেন- জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আব্দুল ওয়াহাব মিঞ্চা, বিচাপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার।

 আজ সকালে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা রিভিউ আবেদন ও খালাস চেয়ে করা সাঈদীর রিভিউ আবেদনের দ্বিতীয় দিনের শুনানি শুরু হয়। আপিল বিভাগ উভয় পক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়ে এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে সাঈদীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সাঈদীর বিচার শুরু হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর।

 জনপ্রিয় উপন্যাসিক ও নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের বাবা তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার ফয়জুর রহমান কে হত্যার সাথে সাঈদী জড়িত ছির বলে অভিযোগ করেছেন সাহিত্যিক ড.মুহাম্মদ জাফর ইকবাল এবং শহীদের মেয়ে সুফিয়া হায়দার। তারা জানান যে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর সহায়তায় তাদের বাবা ফয়জুর রহমানকে পাকিস্তানী সেনারা হত্যা করে এবং পরদিন তাদের বাড়িটি সম্পূর্ণ লুট করে নিয়ে যায় সাঈদী।

তখনকার মহকুমা এসডিপিও ফয়জুর রহমান (সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ ও মুহাম্মদ জাফর ইকবালের বাবা), ভারপ্রাপ্ত এসডিও আব্দুর রাজ্জাক এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান, স্কুল হেডমাস্টার আব্দুর গফফার মিয়া, সমাজসেবী শামসুল হক ফরাজী, অতুল কর্মকার প্রমুখ সরকারি কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের সাঈদীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় হত্যা করা হয়। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহকারী ভগিরথীকে তার নির্দেশেই মটর সাইকেলের পিছনে বেঁধে পাঁচ মাইল পথ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়।

পাড়ের হাট ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দীন খান জানিয়েছেন সাঈদীর পরামর্শ, পরিকল্পনা ও প্রণীত তালিকা অনুযায়ী এলাকার বুদ্ধিজীবি ও ছাত্রদের নির্মম ভাবে পইকারি হারে হত্যা করা হয়।
ইন্দুরকানি থানার আনোয়ার আহমেদ জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা পিরোজপুরের নিখিল পালের বাড়ি দখল করে তা পিরোজপুর জামে মসজিদের গনিমতের মাল বলে ঘোষনা দেয়।

পাড়ের হাট বন্দরের মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষের দিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের রেশন সংগ্রহ করতে গেলে দেখেন পিরোজপুর শান্তি কমিটি ও রাজাকার নেতাদের সেদিন পাকিস্তানি দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল দোলোয়ার হোসেন সাঈদী, সেকান্দার শিকদার, মোসলেহ উদ্দীন, দানেশ মোল্লা এরা। তিনি আরো জানান, সাঈদী এবং তার সহযোগীরা ইপিআর সুবাদার আব্দুল আজিজ, পাড়েরহাট বন্দরের কৃষ্ণকান্ত সাহা, বাণীকান্ত শিকদার, তরুণীকান্ত শিকদার এবং আরো অনেককে ধরে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে। সাঈদী হরি সাধু ও বিপদ সাহার মেয়েদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। বিখ্যাত তালুকদার বাড়ি লুট করে। ওই বাড়ি থেকে ২০/২৫ জন মহিলাকে ধরে পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে পাঠায়।

পাড়ের হাট ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিয়ন কমান্ডারের মিজান ১৯৮৭ সালে মাসিক নিপুন পত্রিকায় অভিযোগ করেছিলেন “ দেলোয়ার হোসেন সাঈদী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় লিপ্ত ছিল। সে ধর্মের দোহাই দিয়ে পাড়েরহাট বন্দরের হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি লুট করে। মদন নামের একজন হিন্দু ব্যবসায়ীর বাজারের দোকান ঘর ভেঙ্গে নিজের বাড়ি নিয়ে যায়।দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর অপকর্ম ও দেশদ্রোহিতার কথা এলাকায় হাজার হাজার হিন্দু-মুসলমান আজও ভুলতে পারেনি।”

১৯৯৩ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণআদালতের গণতদন্ত কমিশনকে পিরোজপুর এডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক খান জানিয়েছিলেন যে সাঈদী যুদ্ধের সময় পাড়ের হাট বন্দরের বিপদ সাহার বাড়ি জোরপুর্বক দখল করে সেখানেই বসবাস করতো। এখান থেকেই সে যাবতীয় স্বাধীনতা বিরোধী কাজ পরিচালিত করতো। এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদ্যদের তালিকা প্রস্তুত করে পাকিস্তানী সেনদের সরবরাহ করতো সে। তিনি আরো জনিয়েছেন যে সাঈদী পিরোজপুরের পাকিস্তানী সেনাদের জন্যে জোরপুর্বক মেয়েদের ধরে এনে তাদের ক্যাস্পে পাঠাতো। বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণদের ধরে এনে সে রাজাকার ও আল বদর বাহিনীতে ভর্তি করাতে বাধ্য করতো।

পিরোজপুরের এডভোকেট আলী হায়দার খান ও সাঈদীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনছেন। তিনি জানিয়েছেন ‘সাইদীর সহায়তায় তাদের এলাকার হিমাংশু বাবুর বড় ভাই ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করা হয়। পিরোজপুরের মেধাবী ছাত্র গণপতি হালদারকে সাঈদী ধরে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে।

ছাড়া যুদ্ধের সময় সাবেক ইপিআর সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজীজ কে সাঈদীর সহায়তায় নির্মম ভাবে হত্যাকরা হয় বলে ও অভিযোগ আছে।

মানিক পশারি ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুরে সাঈদীসহ আরো চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মানিক পশারি অভিযোগ করেন যে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর নেতৃত্বে তাদের বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করা হয়েছিল এবং বাড়ির তত্ত্বাধায়ককে হত্যা করা হয়েছিল। এছাড়া আরো একটি মামলা পিরোজপুর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তার বিরুদ্ধে দায়ের করেন মহিউদ্দীন আলম হাওলাদার নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা।

হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর সাঈদী আপিল করলে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যে রায় দেয়, তাতে সাজা কমে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ আসে।

আপিলের রায়ে ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে হত্যা, নিপীড়ন, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্মান্তরে বাধ্য করায় সাঈদীকে ‘যাবজ্জীবন’ কারাদণ্ড দেয়া হয়। যাবজ্জীবন বলতে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর সময় পর্যন্ত’ কারাবাস বোঝাবে বলে ব্যাখ্যা দেয় আদালত। এছাড়া ৮ নম্বর অভিযোগের একাংশের জন্য সাঈদীকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৭ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আপিল বিভাগ।

এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে আগুন দেও্য়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীর ফাঁসির রায় দিয়েছিল। আপিলের রায়ের ১৫ মাস পর ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ আদালত এর পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করলে বিষয়টি রিভিউয়ের পর্যায়ে আসে।এরপর গতবছর ১২ জানুয়ারি সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর পাঁচদিনের মাথায় খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন সাঈদী।

দুটি আবেদনই খারিজ হয়ে যাওয়ায় এই যুদ্ধাপরাধীর আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজাই বহাল থাকল।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three + 17 =