রথীশ চন্দ্র ভৌমিক ওরফে বাবু সোনার হত্যা : স্ত্রী দীপা ভৌমিক ও কামরুলসহ ৪ জন গ্রেফতার

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

রংপুরে আইনজীবী রথীশচন্দ্র ভৌমিক ওরফে বাবুসোনা  নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় গত মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে তাঁর লাশ উদ্ধার হয়েছে। নগরের তাজহাট বাবুপাড়ায় বাবুসোনার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার নির্মাণাধীন একটি বাড়ি থেকে লাশ উদ্ধার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র‌্যাব। নিহত  পিপি রথীশ চন্দ্র  সাক্ষী ছিলেন একাত্তরের ঘাতক জামায়াতের  সাধারণ সম্পাদক এ টি এম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ মামলায়  । এ টি এম আজহারুল ইসলাম আইনজীবী রথীশচন্দ্র ভৌমিক  এর বাবা এবং চাচা কে হত্য়া করে। ঘাতক আজহার এর মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয় । মৃত্যুদন্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করেছে জামায়াত নেতা আজহার ।

এছাড়া রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি ও মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন তিনি। কাউনিয়া উপজেলার টেপামাধুপুর উপজেলার  মাজারের খাদেম রহমত আলীকে ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর  হত্যার দায়ে ৭ জেএমবি সদস্যকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয় গত ১৮ মার্চ ।  ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ৫জেএমবি সদস্য কে ফাঁসির দন্ডাদেশ দেয়া হয় জাপানি নাগরিক হোসি কোনিও কে হত্যার দায়ে  । 

গত শুক্রবার আইনজীবী রথীশ নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর। তাঁকে উদ্ধারের দাবিতে আইনজীবীসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো মানববন্ধন, বিক্ষোভ, গণ-অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।
অ্যাডভোকেট রথীশচন্দ্র ভৌমিক বাবুসোনা রংপুর আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সহসাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক। এ ছাড়া হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের রংপুর বিভাগের ট্রাস্টি, পূজা উদ্যাপন পরিষদ রংপুর জেলার সভাপতি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি। আর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা সহ  জে এমবি র নাশকতার ঘটনা তে পিপি  হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রথীশ রথীশচন্দ্র ভৌমিক ।  এ কারণে সাধারণ মানুষ মনে করে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কিংবা জঙ্গিগোষ্ঠী বাবুসোনার হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে।

নগরের ডিমলা রাজ দেবত্তোর স্টেট নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। এ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় হওয়া মামলার বাদী ছিলেন বাবুসোনা। জমির অবৈধ দখলদাররা বাবুসোনাকে ধরে নিয়ে গেছে বলে ও ধারণা করেন অনেকে। তবে র‌্যাবের হেফাজতে বন্দী দীপার বক্তব্য তুলে ধরে র‌্যাবের  দাবি রথীশের স্ত্রী ঘটিয়েছে এ হত্যার ঘটনা। বাবুসোনা নিহত হওয়ার খবর জানাজানি হলে তার বাসায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ ভিড় জমায়। স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

দুপুরে তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। বিকেল ৫টায় ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। ফরেনসিক ডা. আকাশ জানায়, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে আইনজীবী বাবু সোনার হত্যার প্রতিবাদে রংপুরের সকল আদালত বর্জন করে আইনজীবীরা। সেই সঙ্গে ৩ দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে নিহত বাবু সোনার মরদেহ আদালত চত্বরে নেয়া হলে সর্বস্তরের হাজারো মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে। একইভাবে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে মরদেহ নেয়া সেখানে হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

কোতোয়ালি থানার ওসি বাবুল মিয়া গতকাল সন্ধ্যায় জানান, এ ঘটনায় রথীশের ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক গত ১ এপ্রিল অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে যে মামলা করেছেন তাতে দীপা ,  কামরুল এবং তাদের সহযোগী সবুজ ও রোকনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে ।

লাশ উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যাব-১৩-এর অধিনায়ক মেজর আরমিন রাব্বী জানিয়েছেন, রথীশের স্ত্রী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীপা ভৌমিক  ওই স্কুলেরই সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম জাফরী সহ পরিকল্পনা করে রথীশকে হত্যা করেছে।

 

দীপা ভৌমিকের এক মাত্র ছেলে ঢাকায় এলএলবি পড়ার কারণে ঢাকায় থাকে আর একমাত্র কন্যা অনিতা ক্লাস নাইনে পড়ে। র‌্যাব  হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে দীপা ও  কামরুলের দেওয়া তথ্য উল্লেখ করে র‌্যাব মহাপরিচালক জানান, ২৯ মার্চ রাতে আগে থেকেই রথীশের বাড়িতে লুকিয়ে ছিল কামরুল। পরে দীপা ভাত ও দুধের সঙ্গে ১০টি ঘুমের বড়ি খাওয়ায় রথীশকে। এরপর তিনি অচেতন হলে দীপা ও কামরুল ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করে। হত্যার পর তাঁর লাশ শোবার ঘরেই রাখা হয়। পরদিন শুক্রবার ভোর ৫টায় ওই বাসা থেকে বের হয়ে গিয়ে সকাল ৯টার দিকে একটি রিকশাভ্যান নিয়ে আসে কামরুল। পরে একটি আলমারিতে লাশ ভরে সেটি পরিবর্তনের নাম করে আলমারিটি নগরের তাজহাটের মোল্লাপাড়ায় কামরুলের ভাইয়ের নির্মাণাধীন বাড়ির মেঝ খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। আলমারি বহনের জন্য তিনজনকে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল কামরুল।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, মঙ্গলবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রথীশের স্ত্রী দীপাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাটি খুঁড়ে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
বেনজীর আহমেদ জানান, বালু খোঁড়াখুঁড়ি ও লাশ লুকানোর সঙ্গে জড়িত থাকায় কামরুলের সাবেক দুই শিক্ষার্থী তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামানকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, ২৬ মার্চ কামরুলের নির্দেশে ৩০০ টাকার বিনিময়ে বালু খুঁড়ে রেখেছিল তারা। পরে তারা শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে ওই লাশ বালু দিয়ে গর্তে ঢেকে রাখে। কামরুল তাদের শিক্ষক হওয়ায় তারা আদেশ পালন করেছে বলে জানায়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তৌহিদা বেগম জানান, দীপা ভৌমিক ও কামরুলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

রথীশ হত্যাকাণ্ড নিয়ে নগরের স্টেশন এলাকায় গতকাল বুধবার দুপুরে র‌্যাব-১৩ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক অশান্তি, বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস থেকেই রথীশকে হত্যা করা হয়েছে। র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিচারের মুখোমুখি করা। এ ব্যাপারে তদন্ত হবে। আর তখনই বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা যাবে।’
 ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

10 − two =