শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ ১১ বীর সন্তানের পবিত্র স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা- সুমি খান

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

 ‘যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা এখনও জানেন/ স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি/ এসো স্বদেশ ব্রতের মহা দীক্ষা লভি/ সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুমি।/ যাঁরা জীর্ণ জাতির বুকে জাগালো আশা/মৌল মলিন মুখে জোগালো ভাষা/ আজি রক্ত কমলে গাঁথা মাল্যখানি/ বিজয় লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরই গলে -মোহিনী চৌধুরীর কথা এবং কৃষ্ঞচন্দ্র দের সুরে এ গানটির মাধ্যমে চরণ ছুঁয়ে যাই  শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ ১১ বীর সন্তানের,  যাঁদের  আত্মদানের মাধ্যমে আসামের দ্বিতীয় সরকারী ভাষার মর্যাদা অর্জন করেছে  মাতৃভাষা বাংলা ।

বীরকন্যা প্রীতিলতা, মাস্টারদা সূর্যসেনের চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশের মাটির সোঁদা গন্ধে সুদূরের গন্ধ মিশে বীর কন্যা কমলা আর তাঁর ১০ সহযোদ্ধার আত্মদানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেয়।  আমি গভীর নিঃশ্বাসে টের পাই সেই পবিত্র রক্তভেজা মাটির ঘ্রাণ ।

  প্রাণ আমার বলে ওঠে-এই গোধূলির ধূসরিমায় শ্যামল মেঘের সীমায় সীমায়, মন যে আমার গুঞ্জরিছে , গুঞ্জরিছে, কোথায় নিরুদ্দেশ !

ফিরে দেখতে হয় মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য্যে বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছিল যেদিন, তার প্রেক্ষাপট কী ছিল !

বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) নিপীড়িত নির্যাতিত বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায় থেকে সবর্স্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়  সংগঠিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন।  

 আইনজীবি ভাষাসৈনিক পাকিস্তানের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীর বর্বর নির্যাতনে নিহত শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভূমিকা এখানে উল্লেখ করতে হয়।

১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেসেরপক্ষ থেকে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য সেই বছর ডিসেম্বরে পূর্ববঙ্গ  থেকে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর ও তিনি মাতৃভূমি আঁকড়ে রয়ে যান মাতৃভূমির বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের সেবা করার মহান লক্ষ্যে। এবং একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক হিসেবে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি অধিবেশনের সকল কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাতেও রাখার দাবি উত্থাপন করেন।

পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাই বেশি এবং তারা বাঙালি বলে যৌক্তিক ভাবে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সকল কার্যাবলীর জন্য ব্যবহার করা উচিত এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত বলে তাঁর জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন। কিন্তু  পাকিস্তানের গভর্নর লিয়াকত আলী খান সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি নাকচ করে দেন।

এর মধ্যেই বাঙ্গালীর মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে বাংলা ভাষাকে ঘিরে আন্দোলন গড়ে উঠে । তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণ দাবীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও এর বীজ  প্রোথিত হয়েছিল অনেক আগে, যার ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তানের উদ্ভব হয়। কিন্তু পাকিস্তানের দুটি অংশ – পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে মৌলিক পার্থক্য ছিল বিশাল। যে কারণে  নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর পাকিস্তান সরকার এবং উর্দুভাষী পাকিস্তানীদের নিপীড়ন সর্বোচ্চ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে ঘোষণা করা হয় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এমন অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বাংলার দামাল সন্তানেরা।পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়।স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকারের চরম নিপীড়নের প্রতিবাদে রাজপথে নামলেন ছাত্র ছাত্রী ।

বাংলা মায়ের সন্তানেরা পাকিস্তান সরকারের এমন বৈষম্যমূলক অন্যায় সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি্। মায়ের ভাষা বাংলাকে সম-মর্যাদা দেবার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে জনরোষ ফুঁসে ওঠে। আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সমাবেশ ,মিছিল বেআইনী ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮)  ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে।

গুলিতে নিহত হন রফিক,সালাম,বরকতসহ আরও অনেকে। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। ভয়াবহ এ রক্তাক্ত হামলার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের সন্তান মাহবুব উল আলম চৌধুরী তাৎক্ষণিক বাবে লিখে ফেলন, কাঁদতে আসিনি , ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি শিরোনামের কবিতা। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

  গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে।তারই অনুপ্রেরণা সদ্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের আসামে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৬১ সালে অহমিয়া একমাত্র ভাষা হবার স্বৈরাচারী ঘোষণার প্রতিবাদে ১৯৬১ সালের ১৯শে মে, ভাষা-আন্দোলনকারীরা শিলচরে রেলপথ অবরোধ করেন। সেই অবরোধ মিছিলে গুলি চালায় আসাম রাইফেলস-এর একটি ব্যাটেলিয়ন। শহীদ হন ভাষা-আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ কমলা ভট্টাচার্য্য সহ মোট ১১ জন।

 ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে যা বিশ্বজুড়ে সাংবার্ষিকভাবে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদযাপন করা হয়।

বাংলাদেশে যে  অসীম সাহসী বীর সন্তানেরা ভাষার লড়াইয়ে জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করেছিলেন, আমার বাবা সাইফুদ্দিন খান তাঁদের অন্যতম।  তাঁর অন্য সহযোদ্ধাদের মতো কৈশোর থেকে দেশমাতৃকার কল্যাণে নিবেদিত থেকে প্রাণ বাজি রেখেছিলেন। সারা জীবন পথে প্রান্তরে কারাগারে দুঃসহ জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালে তিনি প্রয়াত হন।

এমন মাতৃভক্ত  বীর সন্তানের রক্ত  যেমন আমার ধমনীতে , তেমনি শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ ১১ শহীদের রক্তও আমার শিরায় শিরায় বইছে বলে আমি বিশ্বাস করি , যার টানে আজ ২০১৭ সালের মে মাসে আমি একাত্ম হই শিলচর ভাষা শহীদ দিবসের ৪৮ তম দিবসের স্মরণ সভার উদ্যোক্তাদের মহতি আয়োজনের সাথে। যা শুধু মাত্র আমার দুঃখিনি  বর্ণমালা বাংলার টানে ; দীনদুঃখিনি বাংলা মায়ের নাড়িছেঁড়া ধনের দায়বদ্ধতার  ইস্পাত কঠিন অবস্থান  থেকে।

 ১৯৬১ সালে আসাম রাজ্যসরকার অহমিয়া-কে একমাত্র সরকারী ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলে বরাক উপত্যকার বাঙালীরা আন্দোলনে নামেন। ক্রমশঃ তীব্রতর হতে থাকে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই।

১৯৬১ সালের ১৯শে মে, ভাষা-আন্দোলনকারীরা শিলচরে রেলপথ অবরোধ করার সময়ে তাঁদের ওপর গুলি চালায় আসাম রাইফেলস-এর একটি ব্যাটেলিয়ন। শহীদ হন ভাষা-আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ কমলা ভট্টাচার্য্য সহ মোট ১১ জন। আহত হন অর্ধশতাধিক। তাঁদের আত্মবলিদান আসাম সরকার-কে বাধ্য করে বাংলা-কে দ্বিতীয় সরকারী ভাষার মর্যাদা দিতে।

সেই  বর্বরোচিত হত্যার ৪৮তম বর্ষপূর্তিতে বাংলা মায়ের সন্তানেরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে সেই শহীদদের,যাঁরা জীবনের বিনিময়ে বাংলাভাষা ও বাঙালীর অধিকার রক্ষা করেছেন।

বিশ্বজয়ী বাঙালী যেন কখনো এই বীর যোদ্ধাদের আত্মদানের অমর্যাদা না করে। সারা বিশ্বের যে প্রান্তে যে বাঙ্গালি যে অবস্থানেই আছেন,  প্রতিটি বাঙালি যেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে পরম শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেন শহীদ কমলা ভট্টাচার্য সহ ১১ শহীদকে ।

বাংলা মায়ের সন্তানদের নিঃশেষে প্রাণ বলিদানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নিয়ে যেতে হবে আমাদের । আর তাই দেশ কাল জাতি, বর্ণ , আন্তর্জাতিক সীমারেখা ভেদ করে হাতে হাত রেখে একাত্ম হতে হবে শিকড়ের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ।

মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের অগ্রসনিক একাত্তরে আত্ম দানকারী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মহান স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ।

শিলচরের কমলা ভট্টাচার্য  ও তাঁর ১১ সহযোদ্ধার পবিত্র আত্মদান এবং এপার বাংলার শহীদ রফিক, বরকত জব্বারের আত্মদান একই দাবিতে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার  লড়াই কখনো বৃথা যেতে পারেনা।  প্রাণ থাকতে আমরা হারবো না!পাঁজর দিয়ে  আমরা দুর্গ-ঘাঁটি গড়তে জানি !

প্রাণ থাকতে পূরবদেশের পুরনারীদের গর্ভজাত সন্তানদের বীরোচিত আত্মোৎসর্গের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কখনো হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। আর তাই শত সহস্র বছর পরও মাতৃভাষার লড়াইয়ের এই অকুতোভয় সৈনিকদের আত্মদান স্মরণ করবে বাঙ্গালি।  

জয় বাংলা বাংলার জয় !

 

 

 

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − 7 =