শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের পুত্র সুমন জাহিদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সুমন জাহিদের (৫৫ ) ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে এই ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, নিহতের মাথায়, পিঠে ও মুখে আঘাত দেখা গেছে। এ ছাড়া তাঁর শরীর থেকে মাথাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘বিচ্ছিন্ন স্থানটি দেখে ধারণা করা হচ্ছে যে, ট্রেনের চাকায় সুমনের মাথাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবু আমরা ভিসেরা সংগ্রহ করেছি ভিসেরা রিপোর্ট এলে বিস্তারিত জানা যাবে।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সোহেল মাহমুদ জানান, মৃত্যুর আগে চেতনানাশক কিছু ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা , এই জন্যই ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে  বিস্তারিত জানা যাবে।

অন্যদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সুমন জাহিদের বড় ভায়রা এটিএম এমদাদুল হক বুলবুল বলেছেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কে বা কারা তাকে উত্তর শাজাহানপুরের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তার পিছু পিছু গিয়ে খিলগাঁও বাগিচা এলাকায় হিকমাহ আই হসপিটালের সামনে রেললাইনে পাশের একটি ঝুঁপড়িতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানেই তাকে গলা কেটে হত্যা করে রেলওয়ে লাইনে ফেলে দেওয়া হয়।’এরপরই রেললাইনের পাশে তার লাশ পাওয়ার খবর শোনা যায়। সুতরাং, তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’

এটিএম এমদাদুল হক বুলবুল বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে অফিসে চলে যাই। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে সুমন জাহিদের স্ত্রী টুইসির ফোন পেয়ে দ্রুত ছুটে যাই তাদের বাসায়।’

দীর্ঘ এক/দেড় বছর ধরেই সুমন জাহিদকে একের পর এক হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। সবশেষ গত মাসেও তাকে মুঠোফোনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেয়া হয়েছিল। গত বছর নিজের নিরাপত্তা চেয়ে শাজাহানপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন সুমন।

 সুমন জাহিদের শ্যালক কাজী বখতিয়ার উদ্দীন  বলেন— মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার পর থেকে বার বার দুলাভাইকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে। একবার তিনি নিজের নিরাপত্তা চেয়ে শাজাহানপুর থানায় জিডিও করেছিলেন।

তিনি বলেন, দুলাভাই খুবই সাবধানে চলাফেরা করতেন। প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য তিনি শাজাহানপুরের বাসা থেকে বের হতেন আর খুবই সাবধানে চলতেন। শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব শক্ত-সামর্থ্যও ছিলেন। তিনি আত্মহত্যা করেছেন কিংবা দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সেটা আমরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না। আমাদের ধারণা তাকে কেউ হত্যা করেছে।

১০/১৫ দিন আগে শাজাহানপুর থানা থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছিল–আপনি একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন, আপনার ওপর হুমকি আছে।

নিহত এ ব্যাংক কর্মকর্তার পরিবার ও স্বজনরা বলছেন, সুমন জাহিদ দুই বছর ধরেই হুমকির মুখে ছিলেন। কারণ তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার একজন সাক্ষী ছিলেন। হুমকিদাতারাই তাকে হত্যা করে রেললাইনের ওপর ফেলে গেছে বলে ধারণা তাদের।

যদিও পুলিশ ধারণা করছে, ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যু হয়েছে সুমন জাহিদের। বৃহস্পতিবার সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে নিশ্চিত করেন কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক।

তিনি জানান, সকাল ১০টার দিকে খিলগাঁওয়ের বাগিচা নামক এলাকায় সুমন জাহিদ ট্রেনে কাটা পড়েন। তার লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করছি, ট্রেনে কাটা পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে।

লাশ নিয়ে ঢামেক হাসপাতালের মর্গে যান রেলওয়ে থানার এসআই আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। রেললাইন ঘেঁষেই সুমন জাহিদের লাশ পড়ে ছিল। আমরা ধারণা করছি, ট্রেনের চাকা তার গলার ওপর দিয়ে গেছে। তবে কোন ট্রেন তা আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি।’

শাজাহানপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল মাবুদ  জানান, নিহত সুমন জাহিদ শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দুই জনের বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন বলেও আমরা জানতে পেরেছি।

তিনি বলেন, সুমন নিজের নিরাপত্তা চেয়ে গত বছর থানায় জিডি করেছিলেন। এরপর থেকে প্রতি মাসেই পুলিশের একটি দল একবার করে তার বাড়িতে যেত। প্রাথমিকভাবে আমরা যতটুকু জেনেছি ট্রেনে কাটা পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। তবু পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আরেকটি জিডি (নং-৫৯৬) করা হয়েছে।

সুমন জাহিদের ওপর হুমকির বিষয়ে শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল মোল্লা  বলেন, ‘তার ওপর তেমন কোনও হুমকি ছিল না। তিনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষী হওয়ার কারণে আমরা তাকে নিরাপত্তা দিয়ে আসছিলাম। তবে এতে আবার তিনি কিছুটা বিরক্তিবোধ করতেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুমন জাহিদের অর্থ সংক্রান্ত কিছু সমস্যা চলছিল। এছাড়াও পারিবারিক ও মানসিকভাবেও সমস্যায় ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে মামলা নিয়ে ঝামেলাও ছিল। আমরা ধারণা করছি, এসব কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।’

নিহত সুমন জাহিদ ফারমার্স ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার সেকেন্ড অফিসার ছিলেন।  এর আগে সুমন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন।তার গ্রামের বাড়ি ফেনী। উত্তর শাজাহানপুরের ৩১২ নম্বর ভবনের সপ্তম তলায় স্ত্রী দ্রাকসিন্দা জবীন টুইসি ও দুই ছেলেকে নিয়ে বসবাস করতেন সুমন জাহিদ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) মর্গে ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। খিলগাঁও উত্তর শাজাহানপুরে তার নিজ এলাকায় ঝিলপাড় মসজিদে বাদ মাগরিব জানাজা সম্পন্ন করে মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। শুক্রবার দুপুর নাগাদ মরদেহ দাফন করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন সুমন জাহিদ।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twenty + 16 =