শান্তিনিকেতনে দুই প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়ই বাংলাদেশ ভবন নির্মাণ নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করা হয়। তারপরই ভবনটি তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রকৃতির সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যে মেলবন্ধন তা মাথায় রেখেই ভবনের নকশা করা হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে সেটির উদ্বোধন করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বক্তব্য রাখতে উঠে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। বলেন, “বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন করার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। কবিগুরুর হাতে গড়া এই শান্তিনিকেতন। এ তো শুধু ভারত বা পশ্চিমবঙ্গের নয়। আমাদেরও। কবিগুরুর অধিকাংশ কবিতা বাংলাদেশে বসেই লেখা। আমাদের অধিকার তাই একটু বেশি আছে বলেই মনে করি।” এদিন হাসিনার কথায় ফিরে ফিরে আসে বহু ঘটনার স্মৃতি। ১৯৯৯ সালে তাঁকে বিশ্বভারতী থেকে দেশিকোত্তম দেওয়া হয়েছিল। সেই কথা বারবার মনে পড়ছিল তাঁর। বললেন, “বিশ্বভারতীর সঙ্গে সম্পর্ক পুরনো। পড়ার সুযোগ হয়তো পাইনি। তবু আত্মার মিল রয়ে গিয়েছে। এটাকে আমি নিজের বিশ্ববিদ্যালয় বলেই মনে করি। প্রকৃতির কাছে থেকে বৃহত্তর বিশ্বের কাছে নিজেকে মেলে ধরার জন্য এই শান্তিনিকেতন গড়ে তুলেছিলেন। তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ-এ কথাই বারবার মনে হয় তাই।”

”“বাবাকে তো খুব কমই পেয়েছি। বেশিরভাগ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। যখন বাইরে থাকতেন মাঝেমধ্যে আমরা আমাদের গ্রামের বাড়িতে যেতাম। স্টিমারে করে যেতে হত। তো ওই স্টিমারের ডেকে বসে বাবা কবিতা আবৃত্তি করতেন। রবি ঠাকুরের কত কবিতা যে বাবার মুখে শুনেছি!”

“বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারও আমাদের রক্ত দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে। বাবা যখনই কোনও সংকটে পড়তেন তখনই উচ্চারণ করতেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে…। তাঁর দরাজ গলায় শোনা যেত, উদয়ের পথে শুনি কার বাণী। আজ এই বয়সে এসে অনুধাবন করতে পারি, কথাগুলো কতটা সত্য।”

“মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতবর্ষ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। খাবার, চিকিৎসার সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধী-সহ সারা ভারত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের কথা স্মরণ করি। দলমত নির্বিশেষে মুক্তিকামী বাংলার পাশে ভারতের সবাই যে পাশে ছিলেন, তা কখনওই ভোলা যায় না।”

প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা উল্লেখ করেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে তখন একটু একটু করে গড়ে তুলছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই সময় তাঁকে ও তাঁর পরিবারের প্রায় প্রত্যেককে হত্যা করা হয়। যাঁরা কোনক্রমে বেঁচে ছিলেন তাঁরা ভারতেই এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হাসিনারা দুই বোন সে সময় জার্মানিতে ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁদের খবর নেন। থাকার সুযোগ করে দেন।  সেদিন ভারতের স্নেহছায়া না পেলে জীবন কোনদিকে কী মোড় নিত তা জানতেন না।

দুই দেশের ছিটমহল বিনিময় নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর স্মৃতিতে ফিরে আসছিল একাত্তরের স্মৃতি। তখন যেভাবে গোটা ভারত এক হয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তেমনই এবারও এক হয়ে ছিটমহল বিনিময়ে সাহায্য করেছে। তাছাড়া ছিটমহল বিনিময় নিয়ে যুদ্ধ লেগেই থাকে। ভারত ও বাংলাদেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ছিটমহল বিনিময় করেছে। তাঁর মতে, গোটা বিশ্বে তা একটা দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, “মনে হয়েছিল একাত্তর যেন ফিরে এসেছে। এভাবেই দুই প্রতিবেশী দেশ এক হয়ে চলতে চাই। দুটো আলাদা দেশে সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু আমরা তা সমাধান করে ফেলতে পারি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশেই। উন্নত, ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্রমুক্ত করতে হবে বাংলাদেশকে। আমাদের শত্রু একটাই, সেটা হল দারিদ্র।”

বক্তব্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অটুট। বারবারই তার প্রমাণ মিলেছে। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের যেমন জাতীয় কবি, তেমনই ভারতেও তিনি সমান আদৃত। মমতা জানান নজরুল ইসলামের নামে এ বাংলায় এয়ারপোর্ট, বিশ্ববিদ্যালয়, অ্যাকাডেমি ও তীর্থ তৈরি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নামে একটা ভবনও করতে চান বলে প্রস্তাব রাখেন মুখ্যমন্ত্রী।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, শান্তি নিকেতনে বাংলাদেশ ভবন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, অনেক বাধা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের বিশেষ করে যুব সমাজের আকাঙ্খা পূরণে একসঙ্গে এগিয়ে চলার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আজ শান্তি নিকেতনে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার বিকেলে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবাসস্থল বিখ্যাত জোঁড়া সাঁকো ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করেন।কলকাতার উত্তরে রবীন্দ্র সরণীর সিংহী বাগানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটির বিভিন্ন কক্ষ প্রধানমন্ত্রী ঘুরে দেখেন।
পরে সেখানে প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শক বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে রাজভবনে বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করলেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। শুক্রবার রাতে এই বিশেষ নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র-সহ বিশিষ্টজনদের।

এ দিনের নৈশভোজের মেনুতে ছিল পটলের চপ, মাংসের চপ, কুমড়োপোড়া রসা, চিতল মাছের মুইঠ্যা, মোচার ঘন্ট, ঢাকাই মাংস, ছানার ডালনা, চচ্চড়ি, ঝিঙে-আলু পোস্ত, কাঁঠাল কোফ্তা, ভাজা মুগের ডাল, ঝুরঝুরে আলুভাজা, মিষ্টি দই, রাজভোগ, সীতাভোগ এবং সন্দেশ।

রাতে কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলে থাকছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। শনিবার সকালে তাঁর আসানসোলে যাওয়ার কথা। সেখানে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সাম্মানিক ডি লিট দেওয়া হবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার সকালে দুইদিনের সরকারি সফরে কলকাতা পৌঁছান । ধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি নিকেতনের রবীন্দ্র ভবনে পৌঁছালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ সমন্বিত শিক্ষা প্রদানের জন্য একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২১ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি নিকেতনের সমাবর্তনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগদান করেন, যা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও চ্যান্সেলর নরেন্দ্র মোদি
সমাবর্তনে বক্তৃতা করেন- রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্বামী আত্মপরিয়ানানন্দ ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সবুজ কলী সেন।

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 × three =