শাহজাহান বাচ্চু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে নি পুলিশ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

মুন্সিগঞ্জের মুক্তমনা লেখক ও প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনও উদঘাটন করা যায়নি। এ হত্যাকাণ্ডে উগ্রপন্থী জঙ্গিরা জড়িত থাকতে পারে বলে নিহতের পরিবারের ধারণা; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করছে।

নিহত শাহজাহান বাচ্চুর দ্বিতীয় মেয়ে ব্লগার দূর্বা জাহান বলেন, উগ্রপন্থী জঙ্গিরা হামলা করতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল। বাবা দুই বিয়ে করলেও উভয় পরিবারের মাঝে আন্তরিকতার কমতি নেই, পারিবারিক কোন ঝামেলা নেই, এলাকায় বাবার কোন শত্রুও নেই। তাই ক্লুবিহীন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে বাবার আশঙ্কার বিষয়টি হত্যার কারণ বলে ভাবলেও নিশ্চিত নই। পুলিশের তদন্তে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের নাম-পরিচয় জানার অপেক্ষায় রয়েছি।
সোমবার সিরাজদীখানের কাকলদী তিন রাস্তা মোড়ে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় নামিয়ে  গুলি করে হত্যা করা হয় মুন্সিগঞ্জ জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিশাখা প্রকাশনীর এই প্রকাশককে। তিনি লেখালেখিও করতেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে চার ঘাতক দুইটি মোটরসাইকেল আরোহীর কথা জানা গেলেও তাদের মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড তারও সূত্র বের করতে পারেনি র‌্যাব-পুলিশ। স্বামীকে হত্যার ঘটনায় মামলা করেছেন বাচ্চুর দ্বিতীয় স্ত্রী আফজানা জাহান।
মঙ্গলবার বিকেলে নিহত শাহজাহান বাচ্চুর মেয়ে ব্লগার দূর্বা জাহান বলেন, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক উগ্রপন্থী জঙ্গিদের হাতে একের পর এক ব্লগার, মুক্তমনা লেখক, প্রকাশকসহ একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফেসবুকে লেখালেখি করেছেন তার বাবা।
তিনি বলেন, বাবার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে আলোচনায় তার ওপরও উগ্রপন্থী জঙ্গিরা হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কার কথা বলতেন তিনি।তার বাবা উগ্রপন্থী জঙ্গিদের হিটলিস্টে ছিলেন না বলে দাবি করেন দূর্বা জাহান। তিনি বলেন, আমি মেয়ে হলেও এসব বিষয় নিয়ে বাবা আমার সঙ্গেই বন্ধুর মতো খোলামেলা আলোচনা করতেন।

নিহত শাহজাহান বাচ্চুর স্ত্রী ও পুত্র

নিহত শাহজাহান বাচ্চুর দ্বিতীয় স্ত্রী আফসানা জাহান বলেন, ফেসবুকে লেখালেখি করতো আমার স্বামী। মাঝে মধ্যে সে আমাকে বলতো, ‘জঙ্গিরা আমাকে হত্যার হুমকি দেয়’।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত  মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া বলেন, প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চু ব্লগার কিনা না জানলেও মুক্তমনা লেখক হিসেবে যেহেতু লেখালেখির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাই এ বিষয়টিকে প্রধান্য দিয়ে সব কিছু মাথায় রেখেই পুলিশ কাজ করছে।
র‌্যাব-১১’র ভাগ্যকুল ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ও সহকারী পরিচালক নাহিদ হোসেন জনি সাংবাদিকদের বলেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সদর দফতর ও র‌্যাব-১১’র মুন্সীগঞ্জের টিম এ হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ঘাতকদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে। টেকনোলজি ও ফিজিক্যালি-এ দু’টি বিষয় নিয়ে র‌্যাব সদস্যরা তদন্ত কার্যক্রম চলমান রেখেছেন।
এর আগে দুপুরে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া, মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম পিপিএিম, র‌্যাব-১১’র ভাগ্যকুল ক্যাম্পের কমান্ডার নাহিদ হোসেন জনিসহ পুলিশ ও র‌্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিরাজদীখানের কাকলদী তিন রাস্তা এলাকার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
সিরাজদীখান থানার ওসি আবুল কালাম জানান, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শাহজাহান বাচ্চুর দ্বিতীয় স্ত্রী আফজানা জাহান বাদী হয়ে মঙ্গলবার অজ্ঞাত পরিচয় চারজনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেছেন। জেলা ও থানা পুলিশের সকল ইউনিট হত্যাকান্ডেণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতার এবং হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে সোমবার রাতেই ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর পুলিশ পাহারায় লেখক-প্রকাশক শাহজাহান বাচ্চুর লাশ বিকেল ৪টার দিকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এরপরই সিরাজদীখানের কাকালদি গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে কাকালদি সামাজিক কবরস্থানে তার মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
এ সময় মধ্যপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল করিম হাজী ও সিরাজদীখান থানা পুলিশের উপস্থিতিতে লাশ দাফন সম্পন্ন করা হয়।
সোমবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির অদূরে সিরাজদীখানের মধ্যপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব কাকালদী গ্রামের তিন রাস্তার মোড়ে (মুন্সীগঞ্জ-শ্রীনগর সড়কের) আনোয়ার হোসেনের ফার্মেসীতে বসেছিলেন শাহাজাহান বাচ্চু।
এক পর্যায়ে চা পান শেষে সিগারেট কিনতে পাশের নাহিদের দোকানের সামনে যাওয়া মাত্রই হেলমেট পরা চার দুর্বৃত্ত তার বুকের ডান পাশে গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়ে যান শাহজাহান বাচ্চু।
এ সময় সিরাজদিখান থানার এএসআই মাসুম ওই রাস্তা দিয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে সিরাজদীখান থানায় যাওয়ার পথে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে ঘাতকরা তাকে লক্ষ্য করেও এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এরপর পালিয়ে যায় তারা।
শাজাহান বাচ্চু উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম কাকালদি গ্রামের মরহুম মমতাজ উদ্দিনের ছেলে। তিনি মুক্তমনা লেখক ও ঢাকার বাংলাবাজারে বিশাকা প্রকাশনীর সত্বাধিকারী এবং সাপ্তাহিক আমাদের বিক্রমপুর পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

nine + one =