শিক্ষাসনদের নামই থাকবে জাতীয় পরিচয়পত্রে:হিন্দু নারীদের স্বামীর পদবি দেয়ার সুযোগ বন্ধে ক্ষোভ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

জাতীয় পরিচয়পত্রে বিবাহিত হিন্দু নারীদের নামের সঙ্গে স্বামীর নামের অংশ বা পদবি ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, বিবাহিত হিন্দু নারীদের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষা সনদ হুবহু অনুসরণ করতে হবে। এতে শিক্ষা সনদে যে নাম থাকবে তা বিয়ের পরে পরিবর্তন করে স্বামীর নামের পদবি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। যাদের শিক্ষা সনদ থাকবে না, তাদের ক্ষেত্রে অন্য কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। একই রীতি অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা ধর্মীয় আচারের ওপর হস্তক্ষেপ।

কমিশন থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষা সনদে যে নাম থাকবে সেটাই জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) ব্যবহার করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটার তালিকার সংশোধনে ব্যাপক হারে নাম পরিবর্তনের আবেদন আসছে। এসব আবেদন বিবেচনায় নিতে গিয়ে তাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। ইসির এনআইডি বিভাগের পরিচালক (যুগ্ম সচিব-অপারেশন) আবদুল বাতেন জানান, সোমবারের কমিশন সভায় এ বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছিল।

বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, একজন আবেদনকারী মিতা সরকার নিজ নাম সংশোধনের জন্য হলফনামায় উল্লেখ করেন, সনাতন ধর্মের রীতিনীতি অনুযায়ী মেয়েদের বিয়ের পর স্বামীর গোত্রে গোত্রান্বিত হয়। তাই পরিচয়পত্রে মিতা নামের পরে সরকার (পিতার গোত্র) বাদ দিয়ে সেখানে সিংহ রায় (স্বামীর গোত্র) প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন। এ আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আবেদনকারী স্নাতক পাস। যে মন্দিরে বিয়ে হয়েছে সেখান থেকে প্রমাণপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। কার্যপত্রে এ আবেদনকারীর বিষয়টি উল্লেখ করে আরও বলা হয়, হিন্দু বিবাহিত নারীদের কাছ থেকে স্বামীর পদবি ধারণের এমন অসংখ্য আবেদন পাওয়া যাচ্ছে। তারা সন্তানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে, জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম (বাবার পদবিসহ) উল্লেখ করেন। এমন অবস্থায় মায়ের শিক্ষা সনদে বাবা/স্বামীর পদবি না থাকলেও স্বামী/বাবার পদবি দিয়ে মায়ের পরিচয়পত্র সংশোধন হবে কি-না, এ বিষয়ে কমন সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

এ বিষয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত মনে করেন, বিয়ের মাধ্যমে হিন্দু নারীরা বাবার গোত্র থেকে স্বামীর গোত্রে চলে যায়। তাই স্বামীর গোত্র বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এতে লাখ লাখ হিন্দু নারী অবর্ণনীয় হয়রানির শিকার হবেন। তাদের সামাজিক জীবনে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে।

শত শত বছর ধরে ধর্মীয় রীতিনীতির অংশ হিসেবে বিয়ের পরে হিন্দু নারীরা স্বামীর পদবি ব্যবহার করে আসছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে এনআইডি বর্জন করা হবে; কিন্তু স্বামীর নামের অংশ বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। তার মতে, ২০০৮ সালে ভোটার তালিকার জন্য নাম-ঠিকানা নেওয়া হয়েছিল। তখন কেউ সনদপত্র মিলিয়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি। ভোটার তালিকার জন্য নাম সংগ্রহ করে; পরে এনআইডি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত তপন ভট্টাচার্য বলেন, একজন নারী কুমারী থেকে বিয়ের মধ্য দিয়ে শ্রীমতি হয়ে স্বামীর দায়িত্বে চলে যান এবং তার উপাধি গ্রহণ করেন। যেদিন থেকে বিয়ে প্রথা শুরু সেদিন থেকেই এটা চালু রয়েছে।

এদিকে ইসির যুগ্ম সচিব আবদুল বাতেন জানান, মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে শিক্ষা সনদের বাইরেও কিছু ডকুমেন্ট যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। বিয়ের কাবিননামা অথবা ওয়ারিশ সার্টিফিকেট যাচাই করে নাম পরিবর্তন করা যায়। কিন্তু হিন্দু নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের কোনো লিখিত কাগজপত্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। তাই তাদের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী বলেন, ব্যক্তি জীবনে ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে কার কী নাম হবে, তা কমিশনের এখতিয়ার নয়। একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই অফিসিয়াল ব্যবহারে একটি নাম রাখতে হবে। বিয়ের আগে ও পরে সেই নাম পরিবর্তনযোগ্য হতে পারে না। পৃথিবীর কোথাও এ সুযোগ নেই। তা সব ধর্মের জন্যই প্রযোজ্য। অতীতে যারা স্বামীর পদবি নিজের নামের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন, তারা সংশোধনের সুযোগ পাবেন। যথাযথ কাগজপত্র দাখিল করলে ইসি অবশ্যই আবেদনকারীদের নাম সংশোধন করে দেবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × four =