শেকড়ের টানে যে জনজোয়ার রুধিবে সে সাধ্য কার….১৪২৫ বরণে বাংলার মানুষের সাথে সচিত্রে সুমি খান

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

হোক না একটি দিন, তারও তো রেশ সুদূরপ্রসারী, অপশক্তির ভীতির আঁচ বলে দেয় এই একদিনের ভেতরে কি তুমুল আলোড়ন বিদ্যমান ! রাজধানীসহ সারা বাংলাদেশে নববর্ষ উদযাপন ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ সম্প্রদায় রাজনৈতিক অরাজনৈতিক মত পরিচয় নির্বিশেষে একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন উৎসবে পরিণত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

১৪২৫ বাংলা নববর্ষে নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো ছিল রাজধানীসহ সারা দেশ । বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শাহবাগ, টিএসসি, রমনা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রবীন্দ্র সরোবর, হাতিরঝিলে ডগস্কোয়াড দিয়ে সুইপিং করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনাপার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং রবীন্দ্র সরোবরে গাড়ি প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল ।
দীর্ঘ পদচারণা আর রোদের তাপ থেকে এ বিপুল সংখ্যক  জনসাধারণকে মুহূর্তের প্রশান্তি দেয়ার লক্ষ্যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাতাসা আর পানির বোতল বিতরণ ছিল প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। যদিও পানি পান শেষে মাঠে ঘাটে যত্রতত্র খালি বোতল ছুড়ে ফেলে দেয়ার মধ্যে জনসচেতনতার প্রকট দারিদ্র্যও চোখে পড়েছে। এসবকিছুর মধ্যেও রমনার বটমূল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চারুকলা, টিএসসি, ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরসহ রাজধানীর সর্বত্রই ভোর থেকে রাত অবধি ছড়ানো ছিল নতুন বছর বরণের কোটি মানুষের বাঁধ ভাঙা প্রাণোচ্ছাস।

রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ জুড়ে বাহারি আলপনায় ফুটিয়ে তোলা হয় আবহমান বাংলার নানা ঐতিহ্য। বর্ষবরণ উৎসবকে রাঙানোর এই আয়োজনে যোগ দেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ডক্টর শিরিন শারমীন চৌধুরী এবং সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। রঙে তুলিতে এক খণ্ড বাংলাদেশ ! মানিক মিয়া এভিনিউয়ের বিস্তৃত রাস্তাজুড়ে আলপনা। বরাবরের মতো পহেলা বৈশাখের আগের রাতে পিচঢালা রাস্তায় আঁকা হয় বর্ণিল ।

সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মর্তুজা কবিরের বাঁশিতে রাগ আহীর ভাঁয়রো পরিবেশনার মধ্য দিয়ে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণের ৫১তম প্রভাতী আয়োজন। হলুদ সবুজ পোশাকে রমনার বটমূলে প্রায় দেড় শতাধিক শিল্পী তাদের সুর-ছন্দ আর তাল-লয়ে বৈশাখের বন্দনা করে স্বাগত জানান নতুন বছর ১৪২৫-কে। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে  ‘গঙ্গা সিন্ধু নর্মদা……. কৈ রে আগের মানুষ কৈ?’, ‘বাঁধনছেঁড়ার সাধন হবে’, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ’, ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল ভালো থেকো…….”….আমি বাংলা মায়ের ছেলে ” এবং সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত ”আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” গেয়ে রমনার বটমূলে ছায়ানট তাদের সমাপনী ঘোষণা করলো, ভোরের মেলা থেকে মানুষ  সারা নগরীতে ছড়িয়ে পড়তে থাকলেন অন্তরে  নতুন বছরের স্নিগ্ধতা নিয়ে।

ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরেও প্রতি বছর বর্ষবরণে ভিড় জমে ভোর থেকে, গীত মূর্ছনাতে মানুষ ভুলে যায় ক্লেদাক্ততা !

” জীর্ণ পুরাতন যাক, ভেসে যাক” শিরোনামে এবারে বর্ষবরণ করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ।`বাংলার মাটি / বাংলার জল/ বাংলার ফুল/ বাংলার ফল/পূণ্য হোক পূণ্য হোক, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, কিংবা আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশী কিনে এসেছি”- র মূর্ছনায় বিহ্বল রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরের বৈশাখী বাতাস । শেষ বিকেলে কয়েক হাজার নারী পুরুষ জড়ো হয় রবীন্দ্র সরোবর এলাকায়। চেয়ারে জায়গা না পেয়ে বসে পড়ে কংক্রিটের বেঞ্চে। কেউ বা মাটিতে। রবীন্দ্র সরোবরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অনুষ্ঠান চলে বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয়ে রাত আটটা পর্যন্ত।

১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারবিরোধি  আন্দোলন থেকে শুরু হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। যাকে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।
শনিবার সকাল ৯ টায় বর্ষবরণের ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে শুরু হয়। এরপর এটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, শাহবাগ ও টিএসসি মোড় ঘুরে ফের চারুকলার সামনে গিয়ে সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে শেষ হয়। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ ও উচ্ছ্বাসে আরো দীপ্ত হয়ে ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ স্লোগানে বাংলা নতুন বছরকে সাদরে বরণ করা হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে।

শোভাযাত্রায় বড় শিল্প কাঠামো ছিল সাতটি। এগুলো হলো বক ও মাছ, মা ও পাখি, সূর্য, হাতি, জেলে, মহিষ, সাইকেলে চড়া ট্যাপা পুতুল।শোভাযাত্রায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন স্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন।

শিশু পার্কের প্রবেশদ্বারে নারকেলবীথি চত্বরে ৩৫ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান – ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর, মানুষের ভিড় সেখানেও । বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সুরের ধারার আয়োজনে থাকছে হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণের আয়োজন।

সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তিকে রুখে দেবার অঙ্গীকার নিয়ে রাজধানীর বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে বাংলা নববর্ষের শোভাযাত্রা বের করে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শোভাযাত্রা উদ্বোধন করেন।

অন্যদিকে, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নিয়েছে।সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে একটি মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং নেতৃত্ব দেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। শোভাযাত্রাটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে রায়সাহেব বাজার, তাঁতীবাজার মোড় হয়ে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিরে আসে।

উল্লেখ্য, হেফাজতি ইসলাম ও অন্যান্য কয়েকটি ইসলামিক দল মঙ্গল শোভাযাত্রা সম্পূর্ণ হারাম এবং বাংলা নববর্ষ পালন হিন্দুয়ানী বলে উল্লেখ করলেও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আজ দেশের সব মাদ্রাসায় মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনের নির্দেশ দিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। গতকাল বৃহস্পতিবার এক আদেশের মাধ্যমে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া দেশের সব স্কুল-কলেজেও মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনের নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

নববর্ষে রাজধানীর প্রেসক্লাব এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন বক্তব্য, বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী খাওয়াদাওয়ার মাধ্যমে সকল সাংবাদিক পরিবারকে একত্রিত করার বিশেষ প্রয়াস রাখে ।

মেলায় যাইরে, কত শত উপলক্ষে মেলাই না ছিল আগে, রথের মেলা, মহররমের মেলা, বৈশাখী মেলা, মাটির খেলনা, শোলার খেলনা, ঘর সাজানো, হাতে তৈরী কত না শিল্পকর্ম, দা বটি খুনতি, মনকাড়া খাবারের স্তুপ আর নাগরদোলা, আরো কত নস্টালজিয়া, আজকালকার শিশু কিশোররা কি করেই তার হদিশ রাখবে ! তারপরেও মেলা হয়,বসে !

ঢাকার প্রান কেন্দ্র উত্তরা ১৩ নং সেক্টরে সোনারগাও জনপদ রোড জমজম টাওয়ারের পশ্চিম পাশে বসেছে তাত বস্ত্র বৈশাখি মেলা। এ মেলা শুরু হয়েছে গত ১২এপ্রিল থেকে এবং মেলা চলবে ১৬ অর্থাৎ নববর্ষের তৃতীয় দিন পর্যন্ত। মেলাতে রয়েছে বৈশাখি শাড়ি, রেশমি চুড়ি,বাচ্চাদের খেলনা সামগ্রি,মুড়ি-মুড়কি,নাগরদোলা, মনমুগ্ধকর বাঙ্গালির প্রানের উৎসব। এ বৈশাখি মেলা সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৮ পর্যন্ত চলবে বলে জানান মেলা কর্তৃপক্ষ।

বাংলা নতুন বছরকে বরণ করছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্ক। বৈশাখের সাজে সাজানো হয়েছে পুরো শপিংমল। শপিংমলের বাইরে খোলা জায়গায় বৈশাখী মেলা ও ভেতরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেহেদী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হয়ে মেলা একটানা চলবে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত।

বাংলা নববর্ষ পালন হিন্দুয়ানী, মঙ্গল শোভাযাত্রা সম্পূর্ণ হারাম ইত্যাদি ইত্যাদি পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসছে এখনো, জবাব দিয়ে চলেছে দেশ, আবারো টের পেলাম, সঞ্জীবনী নিয়ে পথ চলবো, চলতে হবে আমাদের।

 

 

 

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

sixteen − 11 =