শেখার আছে সবার – হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

বগুড়ার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সেন্ট্রাল হাসপাতাল। এবারের পরিস্থিতি আরো গুরুতর। আক্রান্ত নামী প্রতিষ্ঠান, যার উদ্যোক্তা সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক এম আর খান, দেশের স্বাস্থ্যসেবার এক উজ্জ্বল বাতিঘর। অনুকরণীয় অনেক গুণের অধিকারী আরেকজন চিকিৎসক অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি। সাথে আরও নয়জন।

বলছি না, বড় অধ্যাপকের ভুল হতে পারে না। চিকিৎসক তো আল্লাহর ফেরেশতা বা নবী- পয়গম্বর নন, আর দশজনের মত মানুষ। ‘মানবিক ভুল’ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশের চিকিৎসকেরও হতে পারে-এটা মেনে নেয়া হয়।

বলছি না, ক্ষতিগ্রস্ত কোনো রোগী বা তার পরিবার সংক্ষুব্ধ হতে পারবেন না। সংক্ষুব্ধ কোন ব্যক্তি তার ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারবেন, বিচার চাইতে পারবেন, আইনের আশ্রয় অবশ্যই নিতে পারবেন। তার আগে নিজের বিবেকের সাথে আবেগের একটু বোঝাপড়া দরকার আছে যে। জানি, প্রিয় মানুষের মৃত্যু অনেক সময় মানুষের চিন্তাশক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারপরও বলবো, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যে দিকে যাচ্ছে, তা কোনো নাগরিকের জন্য কাম্য হতে পারে না। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে একবার অন্ততঃ বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে। চিকিৎসকের ভুল আদৌ হয়েছে কিনা? ভুল হয়ে থাকলে তা কী ইচ্ছাকৃত? অবহেলা কিংবা অদক্ষতা? একটু যাচাই করুন, তারপর আইনের আশ্রয় নিন, পেশীশক্তির নয়।

বলছি না, জনগণের জানমালের ক্ষতি হলে সাংবাদিক বন্ধুরা তা নিয়ে সংবাদ প্রচার করবেন না। তা বড় চিকিৎসকের ‘ভুল চিকিৎসায়’ হলেও। অবশ্যই লিখবেন, এটাই আপনার কাজ, দায়িত্ব। কিন্তু মনে রাখতে হবে আপনার কলমের শক্তির কথা। শক্তির সঙ্গে দায়িত্ববোধের কথা। এই দু’য়ের গরমিলে সম্ভাব্য অঘটনের কথা। তাই ‘ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু’র সংবাদ দেয়ার আগে একটু যাচাই করা প্রয়োজন হবে না? এই রেওয়াজটা কিন্তু আমাদের গণমাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই আছে। ক্যান্সার নিয়ে নিউজ করতে গিয়ে আমাদের স্বনামধন্য অভিজ্ঞ অনেক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে ফোন করেন টেকনিক্যাল বিষয়ে আরেকটুকু ক্লিয়ার হতে। এতে জনগণ সঠিক তথ্য পায়।

বলছি না, চিকিৎসায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ পুলিশ বিভাগের বন্ধুরা আমলে নিবেন না। অবশ্যই নিবেন। এটা আপনার ডিউটি। কিন্তু অভিযোগ পেলে প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই সরাসরি হত্যা মামলা নিয়ে সিনিয়র চিকিৎসকদের গ্রেফতার করার ধারা চলতে থাকলে, স্বাস্থ্যসেবায় কী প্রভাব পড়তে পারে, ভাববেন না? বনানীর আলোচিত ধর্ষণ মামলা তো তাৎক্ষনিক এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করা হয় নাই? এখানে এত দ্রুততা কেন? চিকিৎসক কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা অপরাধের দায়ে কি সংঘবদ্ধ শক্তি হাসপাতাল ভাঙচুর ও চিকিৎসকদের শারীরিক নির্যাতন করতে পারে? এখানেও জানমালের হেফাজতের দায়িত্ব আছে, তাই না?

বলছি না, কোনো শিক্ষার্থীর দুঃখজনক মৃত্যতে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন না। তবে তার দায়িত্ব পালনে দায়িত্বশীলতা থাকবে না? সরাসরি হত্যা মামলা দায়েরের আগে প্রিয় ছাত্রীর অসুস্থতার বিষয়ে যথেষ্ট ওয়াকেবহাল থাকাও কী দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? হঠকারিতা কী দায়িত্বশীলতার সাথে যায়?

বলছি না, সহপাঠীর ‘ভুল চিকিৎসায়’ মৃত্যুর খবরে শিক্ষার্থীরা সহমর্মিতা অনুভব করবে না। চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলার প্রতিবাদ অবশ্যই করবে। কিন্তু মামলার সাথে হামলা কেন? এতে কারও কি লাভ হবে বিন্দুমাত্র ?

বলছি না, চিকিৎসকরা সবাই ধোয়া তুলসী পাতা। এই দেশে কোনো পেশাতেই কী সবাই এমন হয়? ফ্লাইওভার ভেঙে ডজন ডজন মানুষ মরে না? ব্রিজ ভেঙ্গে মানুষ মরে না? অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ডুবে শত শত মানুষ প্রাণ হারায় না? খাদ্যে ভেজাল কে মেশায়? থানা-পুলিশ নিয়ে মানুষের দুর্ভোগ নেই? তহশীল অফিসে খাজনা দিতে গিয়ে মানুষ হয়রানি হয় না? কোথায় হয় না? তাই বলে, কোন পেশার সব সদস্যকে কী ঢালাও দোষারোপ করা যায়? চিকিৎসকদের প্রতি ঢালাও নেতিবাচক ধারণা পোক্ত হওয়ার আগে আপনাদের কাছে একটি ছোট প্রশ্ন। দেশের সব চিকিৎসককে কোন নির্জন দ্বীপে ‘তৈরি’ করে সারা দেশে হেলিকপ্টারে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে, এমন তো নয়। আমার, আপনার, আমাদের পরিবার থেকেই চিকিৎসকরা উঠে এসেছেন। আমরা সবাই ধোয়া তুলসী পাতা না হয়ে, শুধু চিকিৎসকদের কাছে তা আশা করা কী অন্যায় নয়? কিছু চিকিৎসকদের জন্য কেন আপনার মনে চিকিৎসকদের প্রতি ঢালাও বৈরিভাব থাকবে?

বলছি না, সব চিকিৎসককেই ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহীম, ব্রিগেডিয়ার মালিক হতে হবে। কিন্তু ভেবে দেখবো না, কোথাও আমাদের সুযোগ আছে কিনা আরও একটু মানবিক হওয়ার? মানুষের মনে জায়গা করে নেয়ার? স্যান্ডেল পায়ে, ইন না করা হাফ শার্ট গায়ে, সরলতার প্রতিমূর্তি অমায়িক ভদ্রলোক, নিবেদিত শিক্ষক, হাজার টাকার যুগে ৩০০ টাকা ভিজিট নেয়া, চেম্বারের সমসংখ্যক রোগী প্রতিদিন হাসপাতালে বিনা ভিজিটে দেখা একজন অধ্যাপক আব্দুল্লাহর কাছ থেকে আমাদের চিকিৎসকদের কিছু শেখার নেই?

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক , জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটাল

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × two =