শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশের দিন:আজ মহান মে দিবস

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

আজ পহেলা মে। মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশের দিন। মাঠে-ঘাটে, কলকারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে রক্তঝরা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস সৃষ্টির দিন।

দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এদিন বুকের রক্ত ঝরিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণী দিয়েছেন বিরোধীদলের নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বিশ্বের সব মেহনতি মানুষকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান তারা।

এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ও মন্ত্রী-এমপিরা শ্রমিক শ্রেণীসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্র ও বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে।
দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণ থেকে মুক্তি পেতে ১৮৮৬ সালের এ্দই দিনে বুকের রক্ত ঝরিয়েছিলেন শ্রমজীবী মানুষ।

এরই ধারাবাহিকতায় কল-কারখানায় মাঠেঘাটে খেটে খাওয়া মানুষের গৌরবময় সংহতি ও বিশ্বজুড়ে এক হওয়ার আহ্বান ধ্বনিত হয়েছিল। আমেরিকায় তখন শ্রমিকদের ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করানো হতো। এই দিন ৮ ঘণ্টা শ্রম দিনের দাবিতে শ্রমিকরা এক ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। এর আগে সময় বেঁধে দেয়া হয় ১ মের আগে দাবি না মানলে ধর্মঘট। কিন্তু মালিকপক্ষ কোন সাড়া দেয়নি। শেষে ৪ মে শিকাগো শহরের হে মার্কেটের সামনে শ্রমিকরা সমাবেশের ডাক দেয়। সেই সমাবেশে পুলিশের গুলি ও দাঙ্গায় নিরস্ত্র ১১ শ্রমিক নিহত হন। ওই শ্রমিক হত্যা এবং দাঙ্গা সৃষ্টির জন্য শ্রমিকদের নেতা আগস্ট স্পিজসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয় এবং এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

হে মার্কেটের এ গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। অবশেষে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর দিনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘তুমে দিবস্থ’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ, ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশে এ দিনে সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়েছে। আজ দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। বন্ধ থাকবে আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দেশের বৃহৎ বেসরকারি খাত বস্ত্র, তৈরি পোশাক, নির্মাণ, পরিবহনসহ সব ক্ষেত্রে এখনও সেই ১৫৬ বছর আগের অন্ধকার বিদ্যমান। দু-একটি প্রতিষ্ঠান বাদে বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কারখানায় মে দিবসেও ছুটি দেয়া হয় না।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, মহান মে দিবসের প্রত্যাশা শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে সকলকে । তিনি বলেন,এ দিনটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এক অনন্য গৌরবময় দিন। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উন্নত কর্মপরিবেশ, শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতকরণসহ বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনের কোন বিকল্প নেই। এজন্য উৎপাদনশীলতা ও শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণসহ সুস্থ শিল্প সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা খুবই জরুরি। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশসহ শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মে দিবসের তাৎপর্য এখনও বিশ্বে সমভাবে প্রযোজ্য বলে বাণীতে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বলেন, সরকার শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে লাগসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার এবং উন্নত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘রূপকল্প ২০২১’ ও ‘রূপকল্প ২০৪১’ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ করে সরকার দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পোশাক শিল্পসহ ৩৮টি শিল্পখাতের শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করেছি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ যুগোপযোগী ও আধুনিক করে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা-২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। মহান মে দিবসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রমিক এবং মালিকরা পরস্পর সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে কলকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরও নিবেদিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী মে দিবস উপলক্ষে গৃহীত সব কর্মসূচির সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বাণীতে বলেন, মে দিবসে বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের বিজয়, আনন্দ-উৎসবের এবং নতুন সংগ্রামের শপথ গ্রহণের দিন। মে দিবসের সামগ্রিক ইতিহাসই শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, মুক্তি অর্জন ও আন্তর্জাতিক সংহতির লক্ষ্যে ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রদানে সরকার, মালিক, বিনিয়োগকারীসহ সব পক্ষকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসন তার বাণীতে বলেন, শ্রমিকের অবদানে বিশ্ব অর্থনীতি চাঙ্গা হলেও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। শ্রমজীবী মানুষের রক্তঝরা ঘামেই বিশ্ব সভ্যতার বিকাশ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায় এবং তা রক্ষায় আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি পালনে কখনোই পিছপা হইনি। একই সঙ্গে তাদের উত্তরোত্তর সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করেন।

প্রতিবছরের ন্যায় এবারও রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকাল সাড়ে ৭টায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালির আয়োজন করা হয়েছে। র‌্যালিটি দৈনিক বাংলা থেকে শুরু হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হবে। র‌্যালির উদ্বোধন করবেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। এদিকে মে দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিকেল ৪টায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন। দিবসটি উপলক্ষে বিকেল ৩ ঘটিকায় কাকরাইলের জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক পার্টির উদ্যোগে এক শ্রমিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগ, টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, গ্রীনবাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, সামাজিক, পেশাজীবী এবং সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ সব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এছাড়াও শিল্প এলাকাগুলো আশুলিয়ায় ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনে, গাজীপুর বড়বাড়ী, মেলার তেজগাঁও, নাবিস্কো শহীদ মিনারের সামনে ও মিরপুর সেনপাড়া বিকেল ৪টায় শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

fourteen + nineteen =