শ্রীমঙ্গলের শতবর্ষী “ডিনস্টন সিমেট্রি”:‘ ইন লাভিং মেমোরি অব মাই হাজবেন্ড’

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

পিকলু চক্রবর্ত্তীঃ  ‘ডিনস্টন সিমেট্রি’র অবস্থান শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ১৫ কি.মি. দূরে । জেমস ফিনলে টি কোম্পানির ডিনস্টন চা বাগানের ভেতরে শতবর্ষের স্মৃতিবিজড়িত এই সমাধিস্থল ।পাহাড়ঘেরা চিরসবুজ চা বাগানের মাঝখানে অবস্থিত এ সিমেট্রিতে বৃটিশদের কবর রয়েছে ৪৬ টি।

জেমস ফিনলে চা কোম্পানি  একশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘ডিনস্টন সিমেট্রি’ রক্ষণাবেক্ষণ করছে। পুরো এলাকাজুড়ে কোন কোলাহল নেই, নীরব নিথর চারপাশ।

১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়।এর পর ১৮৮০ সালে শ্রীমঙ্গলে বৃটিশরা বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু করে। সুদূর বৃটেন থেকে এখানে টি প্ল্যান্টার্সদের আগমন ঘটে। তৎকালীন সময়ে যেসব বৃটিশ এবং তাদের স্ত্রী-পুত্র, স্বজন মারা যান তাদের ডিনস্টন সিমেট্রিতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

প্রায়  একশ’ বছর আগে  স্বামীর মৃত্যু সংবাদ শুনে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে শ্রীমঙ্গলে ছুটে এসেছিলেন বৃটিশ নাগরিক জেসিজি। স্বামীর সঙ্গে তার আর শেষ দেখা হয়নি।স্বামীর কবরস্থানে প্রিয়তমা স্ত্রী জেসিজি লিখে গেছেন ‘ইন লাভিং মেমোরি অব মাই হাজবেন্ড’। শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন সিমেট্রিতে নাম পরিচয়হীন পাঁচটি কবরের একটিতে অশ্রুসিক্ত নয়নে  জেসিজি  প্রয়াত স্বামীর উদ্দেশ্যে লিখে গেছেন এই বাণী ।

শতবর্ষের স্মৃতিবিজড়িত শ্রীমঙ্গলের ডিনস্টন সিমেট্রিতে জেসিজির স্বামীর মতো চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এক বৃটিশ দম্পতি। চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে আছে আরও ৯টি নিষ্পাপ শিশু।

জেমস ফিনলে টি কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, জেমস ডিনস্টন চা বাগানের এ সিমেট্রিতে সর্বপ্রথম সমাহিত করা হয় রর্বাট রয়বেইলি নামের এক বৃটিশ নাগরিককে। ৩৮ বছর বয়সে ১৮৮৫ সালের ৩০ শে আগষ্ট তিনি ডিনস্টন চা বাগানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৮৯৬ সালের জুন মাসে শিশু উইলিয়াম জন ও ডেভিড সহাবির মৃত্যু হলে তাদের এখানে সমাহিত করা হয়। ১৯১৮ সালের ১৮ই মে জর্জ উইলিয়াম পিটারের সহধর্মিনী মেরি এলিজাবেথ পিটার মারা গেলে তাঁকে এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। স্ত্রীর মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে ১৯১৯ সালের ২রা অক্টোবর জর্জ উইলিয়াম পিটারও পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন।  ডিনস্টন সিমেট্রির একই আচ্ছাদনে স্ত্রীর কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

১৮৯৬ সালের জুলাই মাসে জাহাজ যোগে নিজ দেশে যাওয়ার পথে মারা যান রামসান্টার। ১৯০২ সালের এপ্রিলে পানিতে ডুবে মারা যান এফডব্উ  এলান। এ দু’জনের মরদেহ পাওয়া যায়নি। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে তাদের বন্ধুরা ডিনস্টন সিমেট্রিতে দু’টি প্রতীকী কবর তৈরি করেন। ১৯১৯ সালের ২০শে জানুয়ারি শ্রীমঙ্গলের দারগাঁও চা বাগানে মারা যান অ্যাডওয়ার্ড ওয়ালেস । সেদিন ছিল তার ২৫তম জন্মদিন। কলেরায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৭ সালের শুরুর দিকে হান্ট নামের একজন বৃটিশ নাগরিক মৃত্যু বরণ করেন ।  তিনিও  ডিনস্টন সিমেট্রিতে শায়িত আছেন।

১৯৩৯ সালে বিশ্বযুদ্ধের সময়  মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের সময়ে অথবা অবতরণের সময় একটি মার্কিন বিমান শ্রীমঙ্গলের উদনাছড়া চা বাগানে বিধ্বস্ত হয়। সেই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত  দুই  বিমানচালকের মরদেহ ডিনস্টন সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়। পরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা এসে ডিনস্টন সিমেট্রির সমাধি  থেকে এই দু’জন বিমান চালকের মৃতদেহ  উঠিয়ে নিজ দেশে নিয়ে যায়।

১৯৩৭ সালের ১৩ই ডিসেম্বর  মারা যান ৩৫ বছর বয়সী গিলবার্ড হেনরি। তার  ছেলে পিটারটেট পিতার সমাধি দেখতে শ্রীমঙ্গল এসেছিলেন। গিলবার্ট হেনরির স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী তার মরদেহের ভস্ম প্রিয়তম স্বামীর পদপ্রান্তে অশ্রুসজল নয়নে রেখে গেছেন পুত্র পিটারটেট।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত পাহাড়ঘেরা চিরসবুজ চা বাগানের মাঝখানে কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে শতবর্ষের স্মৃতিবিজড়িত শ্রীমঙ্গলের  ডিনস্টন সিমেট্রি।এখনো ইতিহাসের খোঁজে ই সমাধিতে ভিড় করেন পর্যটকেরা ।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen + eleven =