সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন, রায় আপনাদেরই পুনর্বিবেচনা করতে হবে

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়ায় সংবিধান, জাতীয় সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অবজ্ঞা করা হয়েছে বলে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এ রায়ের মাধ্যমে দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চাওয়া হচ্ছে মন্তব্য করে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে বলেন, ‘আপনারা এ রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছেন। এ রায় আপনাদেরই পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ’

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়ায় সংবিধান, জাতীয় সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অবজ্ঞা করা হয়েছে বলে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এ রায়ের মাধ্যমে দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চাওয়া হচ্ছে মন্তব্য করে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদে বলেন, ‘আপনারা এ রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেছেন। এ রায় আপনাদেরই পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ’

গতকাল জাতীয় সংসদে এক অনির্ধারিত আলোচনায় তারা এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। এ আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যরা বলেন, জাতীয় সংসদ যদি এ রায় কার্যকর না করে তাহলে রায় কার্যকর হবে না। সংসদ সদস্যরা প্রশ্ন তোলেন, তারা (বিচারপতিগণ) কি আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে? সবারই জবাবদিহিতা আছে। ফেরেশতা, জিন ও ইনসানের জবাবদিহিতা আল্লাহর কাছে। রাষ্ট্রপতির জবাবদিহিতা সংসদের কাছে। সরকারের জবাবদিহিতা সংসদের কাছে। তাদের (বিচারপতি) কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না? তারা কি আল্লাহর মতো জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে গেলেন?  মাগরিবের নামাজের বিরতির পর এ বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন জাসদের এমপি মঈন উদ্দীন খান বাদল। পরে আলোচনায় অংশ নেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সরকারি দলের অধ্যাপক আলী আশরাফ, সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী প্রমুখ। প্রায় ঘন্টাব্যাপী অনির্ধারিত আলোচনায় সংসদ সদস্যরা পূণবিবেবচনার মাধ্যমে ষোড়শ সংশোধনী পুনর্বহাল করে সংবিধান, গণতন্ত্র, সংসদ ও দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শণের জন্য সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি আহ্বান জানান, তারা বলেন, পাকিস্তান ছাড়া বিচারপতিদের অভিসংশনে জুডিশিয়াল কাউন্সিল পদ্ধতি আর কোথাও নেই।

সর্বোচ্চ আদালতই সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। তাহলে সামরিক শাসনের আমলে প্রণীত জুডিশিয়াল কাউন্সিল কীভাবে বৈধ হয়? পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে জুডিশিয়াল কাউন্সিল থাকে কীভাবে? তারা অভিন্ন কণ্ঠে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আইনমন্ত্রীর প্রতি দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা অ্যামিকাস কিউরি ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন। কিন্তু তাদের হাত কোনোভাবেই জাতীয় সংসদ পর্যন্ত লম্বা নয়। হতে পারে না। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের পক্ষে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের। সেই আইনের যতখানি সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততটুকু বাতিল হবে। কিন্তু একটি আইন বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা তারা কোথায় পেলেন? তিনি বলেন, আমরা সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন  করতে পারি। স্পিকার আপনাকেও পারি। কিন্তু তাদেরকে করা যাবে না কেন? তিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, কেউ যদি সংবিধান ধ্বংস করে থাকে তা জিয়াউর রহমান। তিনি পাকিস্তানকে অনুসরণ করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করেন। আজ সেটার জন্য অনেক দয়া হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যারা দাবি করেন সংবিধান প্রণেতা, বাহাত্তরের সংবিধানকে শ্রেষ্ঠ সংবিধান বলেন, তারা কীভাবে সেই বাহাত্তরের সংবিধানের বিরুদ্ধে কথা বলেন? আমি আদালতের রায় নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। কিন্তু অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা অসত্য কথা বলেছেন, জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন। ড. কামাল হোসেনকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, সংবিধান প্রণয়নের সময় আমরা ভারতের সংবিধানকে অনুসরণ করেছিলাম। এখন ভারতে এ বিষয়টি নেই। তার মতো মানুষ কীভাবে এত বড় মিথ্যা কথা বললেন? অ্যামিকাস কিউরিরা অনেক নিকৃষ্টমানের বক্তব্য দিয়েছেন। তারা মানুষের সামনে মুখ দেখাবেন কীভাবে? তারা জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তাদের নিন্দা ও ধিক্কার জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। তিনি এ সময় ভারতের সংবিধানে থাকা বিচারপতিদের অভিশংসনের বিধানটি তুলে ধরে বলেন, আসলে এরা সুবিধাবাদী। যুক্তরাজ্য, ভারত, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের সংবিধানেই বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে রয়েছে। একমাত্র পাকিস্তানের সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে। আইয়ুব খানের প্রণীত সেই আইন আমাদের দেশের অ্যামিকাস কিউরিদের পছন্দ। তিনি আইনমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানিয়ে বলেন, দেশের সংবিধানের যদি কেউ সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন, তিনি হলেন জিয়াউর রহমান। সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ষোড়শ সংশোধনী কোনোভাবেই অবৈধ হতে পারে না। বরং অবৈধ বিষয়টিকেই পুনর্বহাল করে সংবিধান পরিপন্থী রায় দেওয়া হয়েছে কিনা সেটি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর থেকে অনেক বিচারপতি সংবিধান পরিপন্থী কাজ করেছেন। আপনারা কয়জন বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন? রাষ্ট্রপতি বিচারপতি নিয়োগ দেন। সেই রাষ্ট্রপতিকে এই সংসদ অভিশংসন করতে পারলে বিচারপতিদের পারবে না কেন? বাংলাদেশে আর কোনো দিন অসাংবিধানিক শাসন আসবে না। তাই দিবাস্বপ্ন দেখে কারও লাভ নেই। তিনি বলেন,  ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীররা সুবিধাবাদী মানুষ। বিচার বিভাগ স্বাধীন। তবে সংসদ পর্যন্ত হাত লম্বা হতে পারে না। এ সংসদ যদি সর্বোচ্চ আদালতের রায় কার্যকর বা গ্রহণ না করে তবে ওই রায় কখনই কার্যকর হবে না। বিচারপতি বা যে-ই হোক, দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জাতীয় সংসদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমান বিচার বন্ধে ইনডেমনিটি জারি করার সময় কোনো বিচারপতি তো কোনো কথা বলেননি। বরং জাতির পিতা হত্যার বিচার করতে আটজন বিচারপতি রাজি হননি। সর্বোচ্চ আদালত সেসব বিচারপতির বিরুদ্ধে কী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন? তাই সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি অনুরোধ, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করেছেন, নিজেরাই তা পুনর্বহাল করুন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাই হচ্ছে আমাদের বাহাত্তরের মূল সংবিধান। এ সংবিধানকে অবজ্ঞা করার অধিকার কারও নেই। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করলেন, কিন্তু সংবিধানের সঙ্গে কোথায় সাংঘর্ষিক তা আদালত স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এস কে সিনহা) নাম উল্লেখ না করে মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ‘বিচারক যদি এমন কাজ করেন তাতে তার বিচারক থাকা চলে না, অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করেন, অপরাধ করে থাকেন তাহলে তার সাজাটা কীভাবে হবে? এখানে সব বিচারকের সাজার প্রশ্ন আসেনি। যিনি অপরাধ করেছেন তার সাজার বিষয় এসেছে। তিনি বলেন, ন্যাচারাল জাস্টিস বলে একটা কথা আছে। সেই ন্যাচারাল জাস্টিসের ব্যাপারে বক্তব্য হলো— আপনি আপনার বিচার করতে পারেন না। আপনি ভগবান নন যে, আপনি নিজেই নিজের বিচার করবেন। আপনি কি আল্লাহ হয়ে গেছেন যে, বললাম আর হয়ে গেল?

জাসদ এমপি বলেন, রাষ্ট্রপতির অভিশংসন হয় সংসদে। প্রধানমন্ত্রীর অভিশংসন হয় এখানে। স্পিকারের অভিশংসন হয় এখানে। আর আপনি (প্রধান বিচারপতি) বলছেন আমার বিচার আমি করব। তিনি বলেন, সংসদের কোনো আইন যদি সংবিধানের মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্থ করে সেটা আদালত দেখতে পারে। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে মূল কাঠামোর কোথায় ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, সেটা প্রমান করতে হবে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ৯৬ অনুচ্ছেদ আমরা প্রতিস্থাপন করেছিলাম। এটা মূল কাঠামোর কোথায় আঘাত করেছে, আমরা দেখতে চাই। তিনি আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, যে কোন আইন কী আপনি বাতিল করে দিতে পারেন ? সে ক্ষমতা কী আপনাকে দেওয়া হয়েছে? কে দিয়েছে? এই সংসদের ৬৭ বছরের ইতিহাসে কী আদালতের বিষয়ে কী কোন হস্তক্ষেপ আছে ? জাসদ এমপি বলেন, অথর্বদের যদি জনগণ নির্বাচিত করেন, তাহলে আপনার কী করার আছে? এই রায় জনগণের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, তা ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দিলাম।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × 5 =