সংরক্ষণ করা চামড়া দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছেন আড়তদাররা- ট্যানারি মালিকরা অর্ধেক দামে কিনছেন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

চামড়া নিয়ে  অরাজকতা করে এবার চরম লাভবান হলো ট্যানারি মালিক ও  আড়তদারেরা। কোরবানির পশুর চামড়া দরের বিপর্যয় নিয়ে ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা একে অপরকে দুষছেন।  আড়তদাররা অভিযোগ করে আসছেন ট্যানারিগুলো বকেয়া টাকা না দেওয়ায় এবার অর্থের অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।ট্যানারি মালিকরা বলছেন, আড়তের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু ট্যানারির বকেয়া প্রতি বছর থাকে। চামড়া প্রাথমিক পর্যায়ে কম দামে কিনতে এমন পরিস্থিতি আড়তদাররা সৃষ্টি করেছেন।

আড়তদাররা কম দামে চামড়া কিনে সংরক্ষণ করা চামড়া এখন দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরাও গত বছরের চেয়ে অর্ধেক দামে কিনতে পারছেন। ফলে এখন পোয়াবারো ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের।অন্যদিকে মসজিদ ও মাদ্রাসায় এতিম ও গরিব মানুষ প্রাপ্য দাম পান নি।তারা  চামড়া কিনে ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন। ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অনেকে চামড়া কিনে লোকসান দিয়েছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের পোয়াবারো হয়েছে,নানা কৌশলে তারা চামড়া কেনাবেচা করে অতিরিক্ত লাভ তুলেছেন।

চামড়া নিয়ে নানান কারসাজি করে আড়তদার ও ট্যানারি মালিক উভয়েই লাভবান হচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে অসহায় দরিদ্র মানুষ চামড়া বিক্রির অর্থ না পেলেও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ পেয়েছে আড়তদার এবং ট্যানারি মালিকরা। উভয়পক্ষের মধ্যে বকেয়া টাকা পাওনা নিয়ে সংকটের বরফ গলতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে আড়ত থেকে চামড়া কিনতে শুরু করেছে ট্যানারিগুলো।

জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল শনিবার থেকে সারাদেশের হাটগুলো থেকে সংরক্ষণ করা চামড়া কিনতে মাঠে নেমেছেন ট্যানারি মালিকরা।

আড়তদাররাও লবণ দেওয়া কাঁচা চামড়া বিক্রির জন্য হাটে তুলেছেন। বিভিন্ন হাট ঘুরে কিছু কিছু ট্যানারি মালিক চামড়া কিনেছেন। তবে এখনও আড়তদারদের সঙ্গে দর ও চামড়ার মান নিয়ে আলোচনা করছেন ট্যানারিগুলোর প্রতিনিধিরা। গতকাল ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের হাটে কয়েক হাজার পিস চামড়া কেনাবেচা হয়েছে। এ বাজারে বড় আকারের ২৫ থেকে ৩০ বর্গফুটের চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং ছোট চামড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। আড়তদাররা বড় চামড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ও ছোট চামড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকায় কিনেছেন। গত বছরের তুলনায় এবার চামড়ার দাম অর্ধেকে রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নির্ধারিত দরের চেয়েও এখন ট্যানারি মালিকরা প্রায় অর্ধেক দামেই কিনছেন। যদিও তারা এতদিন জানিয়েছিলেন মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনবেন।

গতকাল ময়মনসিংহ ছাড়াও রাজধানী ঢাকার পোস্তার আড়ত, রংপুর, যশোর, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চামড়া কেনাবেচার খবর পাওয়া গেছে। এসব আড়তে মান অনুযায়ী বিভিন্ন দামে চামড়া বিক্রি হয়। চামড়া শিল্পনগরী সাভারের রিলায়েন্স ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান জানান, গতকাল ময়মনসিংহ থেকে নগদ টাকায় প্রায় দেড় হাজার পিস চামড়া কিনেছেন। আগামীকাল টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায় তার প্রতিনিধিরা চামড়া কেনা শুরু করবেন। অন্যান্য ট্যানারির প্রতিনিধিরাও চামড়া কিনছেন। এবার চামড়ার দাম গত বছরের চেয়ে কম রয়েছে। তবে আড়তগুলো যে দামে কিনেছে তার চেয়ে অনেক বেশি দাম দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকার আড়তদাররা বাকিতে বিক্রি করে দ্বিগুণের বেশি লাভ করেন। এর ফলে ট্যানারি মালিকরা অতিরিক্ত দামে ওই চামড়া কিনে লাভ করতে পারেন না। এ কারণে ঢাকার বাইরে থেকে কিনতে শুরু করেছে বেশিরভাগ ট্যানারি।

রাজধানীর লালবাগের পোস্তার আড়তদাররা জানান, এবার কম টাকায় চামড়া কিনলেও সংরক্ষণ করতে অনেক ব্যয় হয়েছে। এ কারণে চামড়া কম দামে বিক্রি করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার পোস্তার আড়তে অনেক ট্যানারি মালিক চামড়া কেনাকাটার জন্য পাইকারদের সঙ্গে আলোচনা করেন। চামড়ার ভেতরে ভালোভাবে লবণ মিশ্রিত হলে পরে ট্যানারিগুলোতে গ্রেড অনুযায়ী ভাগ করে চামড়া পাঠাতে বলা হয়েছে। অনেকের সঙ্গে দর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক ট্যানারি মালিক চামড়া কেনেন নগদ টাকা দিয়ে।

আড়তে বিক্রির সময়ে চামড়ার বেশি দাম নিয়ে আড়তদার ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম  বলেন, এবার চামড়ার দামের চেয়ে লবণ, শ্রমিকের মজুরিসহ সংরক্ষণ ব্যয় বেশি করতে হয়েছে। দেড়শ’ টাকার চামড়া সংরক্ষণে ২০০ টাকা ব্যয় হয়েছে। এ কারণে চামড়ার দাম সাড়ে তিনশ’ টাকা পড়ছে। এর সঙ্গে মুনাফা যোগ করলে ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে হবে।

আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্যানারি মালিকরা পোস্তার আড়তে চামড়া কেনার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। যারা নগদে কিনছেন তাদের চামড়া দেওয়া হচ্ছে। বাকিতে কেনার চেয়ে কম দামেই পাচ্ছেন নগদ ক্রেতারা। তবে এখনও চামড়া ট্যানারিতে সরবরাহ শুরু হয়নি। দু’চার দিন পরে ট্যানারিতে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, চামড়া মজুদ রেখে আড়তদাররা কী করবেন। তারা তো ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। বকেয়া টাকা পড়ে থাকায় তাদের কাছেই চামড়া বিক্রি করতে হবে অনেক আড়তদারকে। তবে এ বিষয়ে রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন আড়তদাররা।

এদিকে গতকাল সকালে কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পাওনা টাকা পরিশোধ না করলে ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করবেন না তারা।তবে  গতকাল সন্ধ্যার পর আড়তদাররা জানান, চামড়া বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তারা। শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন তারা। মন্ত্রণালয় রফতানির সুবিধা নিশ্চিত করলে তারা রফতানি করবেন। সেটি কাঁচা চামড়া হতে পারে কিংবা প্রক্রিয়াজাত চামড়া (ওয়েট ব্লু) হতে পারে। আর ট্যানারি মালিকরা টাকা পরিশোধ করলে রফতানি না করে তাদের কাছেও বিক্রি করবেন আড়তদাররা। ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের প্রায় সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানানো হয়।

রবিবার বিকেল ৩টায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ট্যানারি মালিক, আড়তদার ও কাঁচা চামড়া সংশ্নিষ্টদের নিয়ে বৈঠক হয়। এই বৈঠকে চামড়া কেনাবেচা, চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানিসহ চলমান সংকট সমাধানের বিষয়ে আলোচনা হয়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

nineteen − seven =