সংশপ্তক মানিক সাহার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি নির্ভীক সাংবাদিক মানিক চন্দ্র সাহার ১২ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। প্রেসক্লাব থেকে বাড়ি ফেরার পথে মাথায় বোমা মেরে নৃশংসভাবে তাঁকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।th

মানিক সাহাকে যাঁরা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে  যাঁরা চিনতেন তাঁদের কল্পনাতেও আসেনি কিভাবে এমন সজ্জন, নির্লোভ, পেশাঅন্তপ্রাণ একজন সমাজদরদী ও দেশপ্রিয় ব্যক্তিত্বকে এমন নৃশংসতার বলি হতে হলো। মরণোত্তর একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক মানিক সাহাকে ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবের অদূরে জঙ্গী সন্ত্রাসীরা বোমা হামলা করে হত্যা করে।মানিক সাহার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছে খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং খুলনা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠন।

সাংবাদিকতাকে ব্রত হিসেবে নিয়ে জীবন উৎসর্গ করা এক সংশপ্তকের নাম মানিক সাহা। স্বাধীন, সাহসী, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার বিরল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করে গেছেন অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার, সাহসী  ছিলেন এ কলমযোদ্ধা ।সদালাপী, সৎপ্রাণ, জনপ্রিয় সাংবাদিক মানিক সাহা দৈনিক সংবাদ এবং ডেইলি নিউজের খুলনা প্রতিনিধি এবং বিবিসি’র খুলনা প্রতিনিধি ছিলেন মানিক সাহা।  Wife Family)

১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলোর মধ্যে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল সবচেয়ে বেশী আলোচিত।  বিএনপির সাথে যৌথ ভাবে সরকার গঠন করে জামাতের দুই শীর্ষ নেতা একাত্তরের ঘাতক নিজামী এবং মুজাহিদ  প্রথম বারের মতো মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করার সুযোগ পায় এবং সেই সুযোগে এদেশের মুক্তবুদ্ধির চর্চার গলা টিপে হত্যা করার অপচেষ্টা করে।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনে ভোট কারচুপি করে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভোট কারচুপির হীন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। নির্বাচনের আগেই বিএনপি জামাতের সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের মদদে দেশের সংখ্যালঘু জনগণ এবং  প্রায় তিন শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করে। গ্রেফতার করা হয় কয়েক হাজার হাজার প্রগতিশীল নেতাকর্মীকে। সংখ্যালঘু ভোটারসহ নারী ভোটাররা যাতে ভোট কেন্দ্রে না আসে তার জন্য ভয়ভীতি দেখায় বিএনপি জামাত ক্যাডাররা। নির্বাচনের পর পরই শুরু হয় দেশজুড়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, সমর্থক আর সংখ্যালঘুদের উপর বর্বরোচিত হামলা, নির্যাতন। নির্বিশেষে হামলা চালায় অসহায় সহজ সরল মানুষের উপর। হত্যা, ধর্ষন, নির্যাতনে আত্মহারা হয়ে যায় সমগ্র জাতি। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ কেউ বাদ যায়নি বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীদের অত্যাচার, নির্য়াতন থেকে। হাজার হাজার সংখ্যালঘু মানুষ বাস্তুভিটা থেকে আশ্রয়হীন অবস্থায় পাড়ি জমায় পার্শ্ববর্তী গ্রামে, শহরের মহল্লায়। তারপরও জীবন রক্ষা হয়নি। অনেকে পাঁচ বছর ধরে বাস্তুভিটায় ফিরেও আসতে পারেনি। মানবতার এত বড় অসম্মান এদেশে স্বাধীনতার পর আর কখনও হয়নি। লুণ্ঠিত হয় মানবতা। পাঁচ বছরে ২১ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয় । ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেন  অনেক নারী।  হত্যা করা হয় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এ এস কিবরিয়া, সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাষ্টার সহ অনেককে। ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। অল্পের জন্য রক্ষা পান বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা। সিলেটে গ্রেনেড হামলা চালানো হয় তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর। ২০০৩ সালের ২৫ আগস্ট খুলনায় হত্যা করা হয় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমামকে। দিনেদুপুরে আদালতে পেশাগত কাজে যাওয়ার পথে ঘাতকের বোমা এবং পিস্তলের গুলিতে এ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমামকে হত্যা করা হয়। তাঁর সঙ্গে নিহত হন এক নিরপরাধ রিকশাচালকও। ২০০৩ সালের ৭ জুন বিএনপি সন্ত্রাসীদের চাইনিজ কুরালের উপর্যুপরি আঘাতে নিহত হন নাটোরের জনপ্রিয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। একই বছর ১ ডিসেম্বর লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, টানা পাঁচ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সামসুল ইসলামকে সন্ত্রাসীরা জবাই করে হত্যা করে ।

বিএনপি-জামাত জোট মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, যা তারা এখনও চায়।  ২০০১-০৬ সালের শাসনামলে  বরেণ্য শিক্ষক প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয়।তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকায় নিজ বাড়ির বাইরে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে চারদলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত-শিবিরের নেতৃস্থানীয় সন্ত্রাসীরা। প্রফেসর ইউনুস ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি। অধ্যাপনার বাইরে তিনি বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন।  বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ গোপালকৃষ্ণ মুহুরীকে ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর জামাত-শিবির সন্ত্রাসীরা তাঁর নিজ বাড়িতে মাথায় গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। হত্যার পর দেশে ও বিদেশের ক’টি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল অধ্যক্ষ মুহুরীর নিষ্প্রাণ হৃদয় ব্যথিত করা এক অটোগ্রাফ। সাদা জামায় রক্তের বন্যা, মাথার খুলি থেঁতলে গেছে সন্ত্রাসীর গুলিতে এবং সেখান থেকে ঝরছে রক্ত!  দুঃশাসনের কালে একজন নিরীহ শিক্ষাবিদের জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। নিরাপত্তা ছিল না বিচারপতি কিংবা শুভবাদী সাংবাদিকদের। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নেমে আসে দুর্বিসহ বিপর্যয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজী, ছিনতাই, রাহাজানীতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে পুরো জাতি। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত মৌলবাদী জঙ্গীরা সারাদেশে ৬৩ জেলার ৫০০ টি স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায়। আফগানিস্থানে আল-কায়েদার পক্ষে যুদ্ধ করা জঙ্গীরা সরকারের মদদে গড়ে সশস্ত্র জঙ্গী সংগঠন, জেএমবি। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীর জমজমাট বইমেলা থেকে সন্ধ্যা উত্তীর্ণকালে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন প্রথাবিরোধী লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার জনপ্রিয় শিক্ষক ড. হুমায়ুন আজাদ। অতর্কিতে তাঁকে ধারালো  চাপাতির আঘাতে রক্তাক্ত করে তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের পোষ্য জেএমবি ক্যাডার আতাউর রহমান সানীর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। হুমায়ুন আজাদের উপর আক্রোশের কারণ  ছিল মৌলবাদ বিরোধী বই লেখা। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী  কুখ্যাত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীদের আঘাতে পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন ড. হুমায়ুন আজাদ।

সেই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রেখেছে একাত্তরের ঘাতক এবং তাদের সহযোগিরা ।  সেই হুমকিতে সরকার এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারীতে রয়েছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 9 =