সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক আর নেই- প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির শোক

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

“এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে।
এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির-বেদি থেকে।
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনামসজিদ থেকে।
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে।
আমি তো এসেছি সার্বভৌম বারো ভূঁইয়ার থেকে।
আমি তো এসেছি ‘কমলার দিঘি’, ‘মহুয়ার পালা’ থেকে।
আমি তো এসেছি তিতুমীর আর হাজী শরিয়ত থেকে।
আমি তো এসেছি গীতাঞ্জলি ও অগ্নিবীণার থেকে”  অথবা

“….পুন্নিমার চান বড় হয়রে ধবল।
জননীর দুগ্ধের মত তার দ্যাখোঁ রোশনাই।
ভাবিয়া কি দেখিব, আব্বাস, যদি মরোঁ কোনো দুঃখ নাই।
হামার মরন হয় জীবনের মরন যে নাই।
এক এ নুরলদীন যদি চলি যায়,
হাজার নুরলদীন আসিবে বাংলা।….জাগো বাহে ………কুন্ঠে সবাই! “

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে  শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সব্যসাচী সাহিত্যিক ।তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১।  তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী লেখকের নিজ কুড়িগ্রামের মাটিতে শেষ আশ্রয় পাবেন তিনি।

“অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা , সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে প্রবল শক্তি ছিলেন আমাদের গুরু হক ভাই, সৈয়দ শামসুল হক “-অশ্রসজল নয়নে শোকস্তব্ধ কন্ঠে একথা বললেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে সৈয়দ হকের মরদেহ গুলশানে নিজ বাড়িতে নেওয়া হবে। সেখান থেকে রাতেই লেখকের মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে।
লেখকের মরদেহ কাল বুধবার সকাল ১০টায় চ্যানেল আই কার্যালয়ে নেওয়া হবে। সেখান থেকে বেলা পৌনে ১১টায় মরদেহ নেওয়া হবে বাংলা একাডেমিতে। এরপর বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাঁর মরদেহ হেলিকপ্টারে গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে নেওয়া হবে। সেখানেই সব্যসাচী এই লেখককে দাফন করা হবে।

ক্যান্সারে আক্রান্ত সৈয়দ হক লন্ডনে চিকিৎসা করেও  সুস্থতার আশা নেই জেনে শেষ ক’টি দিন  মাতৃভূমিতে কাটানোর প্রত্যাশায়  সম্প্রতি দেশে ফিরেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। লন্ডন থেকে দেশে ফিরে ইউনাইটেড হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে গতকাল তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরমধ্যেই সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিলো।

দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত সৈয়দ শামসুল হক উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে সস্ত্রীক লন্ডনে গিয়েছিলেন এ বছরের ১৫ এপ্রিল। একইসঙ্গে যুক্তরাজ্যেরও নাগরিক হওয়ায় লন্ডনে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের (এনএইচএস) নিয়মিত চিকিৎসকের (জিপি) মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করান তিনি। এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ম্যাকডোনাল্ডের তত্ত্বাবধানে লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন তিনি। পরে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ নিউসাম ডেভিসের তত্ত্বাবধানে চেলসি অ্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টার হাসপাতালে কেমোথেরাপি নেন। টানা প্রায় তিন মাসের চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন তিনি।

চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন মাত্র ছয় মাস বাঁচবেন কবি।মৃত্যুমুখে দাঁড়ানো এই সময়টা কবি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে চান নিজের দেশে। তাই লন্ডন থেকে দেশে ফিরে ভর্তি হন রাজধানীর ইউনাইটের হাসপাতালে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখতে যান তাকে। নেন তার যাবতীয় চিকিৎসার দায়ভার।১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন সৈয়দ শামসুল হক।

লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম। ছোটগল্প, কবিতা, উপন্যাস, কাব্যনাট্য, শিশুসাহিত্য, নাটক, প্রবন্ধ সাহিত্যের সব শাখায় সমানভাবে অবদান রাখার জন্য তিনি বাংলাদেশের সব্যসাচী লেখক। লেখালেখি শুরু করেন ১২ বছর বয়স থেকেই। সাংবাদিক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে লেখালেখিকেই মূল উপজীব্য হিসেবে নিয়েছিলেন। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক।

সৈয়দ শামসুল হক স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন।

বিখ্যাত সাহিত্যকর্মগুলো হলো—উপন্যাস: ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘খেলা রাম খেলে যা’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’ ও ‘মৃগয়ার কালক্ষেপ’। নাটক: ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নুরলদীনের সারাজীবন’, ‘গণনায়ক’। কবিতা সংকলন: ‘পরানের গহীন ভেতর’, ‘বেজান শহরের জন্য কোরাস’, ‘এক আশ্চর্য সংগ্রামের স্মৃতি’, ‘প্রেমের কবিতা’। শিশুসাহিত্য: ‘সীমান্তের সিংহাসন’।
ব্যক্তিগত জীবনে লেখক দুই সন্তানের জনক। জীবনসঙ্গী মনোরোগের চিকিৎসক ও লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক।

লেখকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস অবলম্বনে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ‘গেরিলা’ সিনেমাটি তৈরি করা হয়েছিল।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twelve − twelve =