‘সমুখে কি শান্তির পারাবার’ – স্যালুট রমা চৌধুরী

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সোমবার (৩ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রমা চৌধুরী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯৩৬ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। চার ছেলে সাগর, টগর, জহর এবং দীপংকরকে নিয়ে ছিল তার সংসার।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি  থাকতেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়। তার স্বামী ভারতে চলে যান। ১৩ মে সকালবেলা পাকিস্তানি হানাদাররা এসে চড়াও হয় তাঁর ঘরে।পশ্চিম পাকিস্তানী ও তাদের এদেশীয় দালালদের হাতে ধরা পরে সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয় রমা চৌধুরীকে, সন্তানের মায়ায় আত্মহনন থেকে নিবৃত্ত থাকলেও মানসিক এক অসীম কষ্ট সেই থেকে বয়ে বেড়ান।  পাকিস্তানী হানাদাররা গানপাউডার লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়িসহ যাবতীয় সহায়-সম্পদ।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে দুই ছেলেকে হারান রমা চৌধুরী।  ঘরবাড়িহীন বাকি আটটি মাস তাঁকে তিনটি শিশুসন্তান আর বৃদ্ধ মাকে নিয়ে জলে-জঙ্গলে লুকিয়ে বেড়াতে হয়েছে। রাতের বেলায় পোড়া ভিটায় এসে কোনোমতে পলিথিন বা খড়কুটো নিয়ে মাথায় আচ্ছাদন দিয়ে কাটিয়েছেন। তারপরেও সুদৃঢ় মানসিক শক্তির জোরে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন !

এদেশের মানুষের সংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতাকে ভ্রূক্ষেপ না করে তার উপর নির্যাতনের ঘটনা একাত্তরের জননী নামক গ্রন্থে প্রকাশ করেন। একাত্তরের জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’ এবং ‘ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’ সহ ১৮টি বই লিখে গেছেন । এসব বই বিক্রি করেই চলতো তার সংসার।

কোমরের আঘাত, গলব্লাডার স্টোন, ডায়াবেটিস, অ্যাজমাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি রমা চৌধুরী ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত  রমা চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অভ অনার দেয়া হয় আজ সোমবার (৩ সেপ্টেম্বর) বেলা সোয়া ১২টার দিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে। এর আগে সকাল সাড়ে দশটার দিকে রমা চৌধুরীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে নিয়ে আসা হলে স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ মরদেহে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

একাত্তরের এ মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম মহানগরের কমান্ডার মোজাফফর আহমদ, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান, লেখক ও শহীদজায়া মুশতারি শফী, মুক্তিযোদ্ধা অমল মিত্র, অধ্যক্ষ রীতা দত্ত, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সহ-সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, ভারপ্রাপ্ত সিটি মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ান, নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু, চসিক কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী, শৈবাল দাশ সুমন, সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন, কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্ত‍া মোহাম্মদ মহসীন, নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু, জেলা শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি রনজিৎ রক্ষিত, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বাবু, উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহ-সভাপতি ডা. চন্দন দাশ, সিপিবি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, ওয়াকার্স পার্টি চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহান প্রমুখ।

এছাড়াও ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সম্মিলিত আবৃত্তি জোট, গণজাগরণ মঞ্চ, উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদ, প্রমা আবৃত্তি সংগঠন, তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সাহিত্য চর্চা পরিষদ, কৃষ্ণকুমারী সিটি করপোরেশন স্কুল, অর্পণাচরণ সিটি করপোরেশন স্কুল, মিউনিসিপ্যাল সিটি করপোরেশন স্কুল, পাহাড়িকা স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

eight + twelve =