সরি মানে কি ? একাত্তরে কি ভুল করে আমাদের পা মাড়িয়ে দিয়েছিলে ?

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail
একাত্তর র ক্ষত সেইদিন ই কিছুটা হলেও  নিরসন হবে, যেদিন পাকিস্তান সরকার একাত্তরের  গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের  কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইবে। যেদিন আমরা বিদেশি সংবাদভাষ্যে গণহত্যায় চিহ্নিত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের দাবিতে দেরিতে হলেও জাতিসংঘে ও আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে ওদের জীবিত বা মরণোত্তর  বিচার  নিশ্চিত করতে পারবো, সেদিন কিছুটা হলেও একাত্তরের ক্ষত শুকাবে । কিন্তু একাত্তরের ত্যাগ আমাদের কেউ ভুলিয়ে দিতে পারবে না, আমাদের  অর্জিত বিজয়ের সাথে অন্তহীন থাকবেন তারা, যারা আমাদের আজকের জন্যে তাদের আগামীকে উৎসর্গ করে গেছেন।
প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন , “আমি পাকিস্তানিদের কখনই বিশ্বাস করি না, যখন তারা গোলাপ ফুল হাতে নিয়েও আসে”। পাকিস্তানের সাংবাদিকরা হামিদ মীর সমেত,  পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান নিয়াজির ভাইয়ের ছেলে ইমরান খানের মতো রাজনীতিবিদরা একাত্তরের নৃশংসতার জন্যে  ‘সরি’ বলে আমাদের দেশের  অনেকের ই প্রশংসা ভাজন হন।কিন্তু সরি মানে কি ? একাত্তরে কি ভুল করে আমাদের পা মাড়িয়ে দিয়েছিলো ? 
৯ মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা প্রায় ৩০ লাখ নিরপরাধ বাঙালিসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য জাতিভূত  মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং প্রায় ৪ লাখ মা-বোনকে ধর্ষণ করেছে। 
যুদ্ধাপরাধের বিচার, সম্পদ ধ্বংস বাবদ ক্ষতিপূরণ, গণহত্যাকে স্বীকৃতি না দিয়ে  কৌশলে পাশ কাটিয়ে গেছে এসব প্রসঙ্গ, ভণ্ডামি করে  এরাই আবার  মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।সাংবাদিক হামিদ মীর  কলাম লেখেন ‘নব্বই বছরের এক বৃদ্ধের ট্রাজেডি’ বা এই জাতীয় নামে ! কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভে সুর মিলিয়ে তেহরিক-ই ইনসাফ দলের প্রধান এই দাবি করেছেন বলে পাকিস্তানের দৈনিক দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে। 
রেডিও পাকিস্তানকে উদ্ধৃত করে সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইমরান এক আইনজীবীকে বলেছেন, কাদের মোল্লা নির্দোষ ছিলেন এবং যে সব অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে,  তার সঙ্গে জামায়াত নেতার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে বর্বরতা চালানোর অন্যতম হোতা আব্দুল্লাহ আহমেদ নিয়াজীর স্বজন ইমরান খান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘রিপ্রাইভ’ এর আইনজীবীকে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেন বলে রেডিও পাকিস্তান জানিয়েছে।
ইমরান খান মনে করেন যে তালেবানরা একটি ‘ধর্মযুদ্ধ’ করছে। বছর খানেক আগে  পেশোয়ার শহরে একটি হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইমরান খান সুস্পষ্ট ভাষায় এই মত দেন। তালেবানদের অবস্থানকে তিনি ‘বৈধ’ হিসেবেও চিহ্নিত করেন।২০০৯ সালে সোয়াত অঞ্চলে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের বিতর্কিত এক রফার প্রতি সর্বপ্রথম সমর্থন জানানো রাজনীতিক ছিলেন ইমরান খান। সেনা এস্টাবলিশমেন্ট ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ইমরান খানের বিশেষ সম্পর্কের ব্যাপারটিও পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে আলোচিত। এত  ‘বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত’ ইমরান খানের বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী ও  যুদ্ধাপরাধীদের  সপক্ষে দাঁড়ানোই কি স্বাভাবিক নয় । 
যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিরুদ্ধে যে কয়টি মানবাধিকার সংগঠন কথা বলে আসছে, সেসবের মধ্যে ‘রিপ্রাইভ’ একটি।যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুুরীর ফাঁসির রায় কার্যকর স্থগিত করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠিও লিখেছিলেন ইমরান খান। 
একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন অধ্যাপক ও সাংবাদিক ওয়ারিস মীর।বাবার পক্ষে ঢাকায় এসে সম্মাননা গ্রহণ করেন পুত্র সাংবাদিক হামিদ মীর। সম্মাননা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখায় বিদেশি বন্ধু হিসেবে পাকিস্তানি কলামিস্ট ওয়ারিস মীরকে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া সম্মাননা ফেরতের ঘোষণা দিয়েছেন তাঁর ছেলে সাংবাদিক হামিদ মীর। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী বলেছিলেন , যারা ১৯৭১-এ পাকিস্তানী গণহত্যার কথা স্বীকার করে না তিনি তারই লেজুড়বৃত্তি করছেন।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে বাংলাদেশ, যা এখনো অব্যহত আছে। স্বাধীন দেশ হিসেবে এই  উদ্যোগ নেয়া বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয় ও অধিকার এবং দেশের মানুষের প্রাণের দাবি । আন্তর্জাতিক মানের যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ায় যখন একেকটি যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হলো, তখন পাকিস্তানের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই আমাদের দেশের পাকিস্তানী বান্ধব পরিমণ্ডলকে- এতে কী বোঝা যায় ! 
বাংলাদেশ  মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করার জন্যে কৃতজ্ঞতাপ্রসূত  বিদেশী  বন্ধুদের সম্মানিত করছে, যাদের মধ্যে পাকিস্তানিরাও রয়েছে, আবার যুদ্ধাপরাধীদের আন্তর্জাতিক আইনি মানদন্ডে বিচার করছে , এই বুক ফোলানো দৃঢ়চেতা বাংলাদেশকে পাকিস্তান কোনোভাবেই সহ্য করে নিতে পারেনি, পারছেনা। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যতবার যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে, ন্যাক্কারজনক কূটনৈতিক ইস্যু তুলে যুক্তিহীন নগ্ন উষ্মার প্রচার চালাতে উদ্যত
হয়েছে, ততবার বাংলাদেশের সাধারণ মানূষ পথে নেমেছে, বাংলাদেশ সরকারও তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছে । 
উল্লেখ্য, হামিদ ই প্রথম সাংবাদিক যিনি একাধিকবার ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এমনকি তোরাবোরা পর্বতগুহায় সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া ওসামার শেষ সাক্ষাৎকারটাও নিয়েছিলেন । এসব সাক্ষাৎকার তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দেয়। তবে হামিদের তালেবান-ঘনিষ্ঠতা প্রমাণিত হয় ২০১০ সালে, যখন তালেবানের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড উসমান পাঞ্জাবির সঙ্গে অপহৃত সাবেক আইএসআই এজেন্টের মুক্তি বিষয়ে তার টেলিফোন-সংলাপ ফাঁস হয়। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয় সে খবর। 
ওই সংলাপে খুব স্পষ্টভাবে হামিদ মীর অপহৃতকে ‘একজন বিশ্বাসঘাতক ব্যাড মুসলিম’ বলে অভিহিত করে তার মুক্তির বিরোধিতা করেন। এরপর অপহৃতের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ফাঁস হওয়া টেলিফোন-সংলাপ নিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি জানান, তার ভয়েজের স্যাম্পল নিয়ে এ কথোপকথন কৃত্রিমভাবে বানানো হয়েছে। আমরা এ প্রসঙ্গে মনে করতে পারি, সাঈদী সংশ্লিষ্ট ফোনালাপ সংক্রান্ত ঘটনা, যা ফাঁস হওয়ার পর জানি সেটা করা সম্ভব নয়।
সবশেষে, কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্ন থেকে মুসলিম লীগ সরকারের স্বৈরশাসন, দমননীতিমূলক শাসনের পাশাপাশি বাংলা-বাঙালিবিরোধী লাগাতার অপপ্রচার পাকিস্তানি জনতার মগজ ধোলাইয়ে সফল হয়েছিল। তাই বাংলাদেশে গণহত্যার বাস্তবতা ও সত্য মেনে নেয়নি পাকিস্তানি শিক্ষিত ও অশিক্ষিত শ্রেণীর মানুষ। তাদের অন্ধ অভিযোগ, বাঙালিরা ভারতের কুমন্ত্রণায় পাকিস্তান ভেঙেছে। তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে গণহত্যার অভিযোগ মিথ্যা। ওটা ভারতীয় প্রচার।
বিশ্ব সাংবাদিকতার ঐতিহ্য বলতে আমরা বুঝি, নির্ভীক, সাহসী, তথ্য ও যুক্তিনিষ্ঠ সৎ সাংবাদিকতা, সেখানে সত্য সন্ধানই মূল নিয়ামক। পশ্চিমা বিশ্বে হলুদ সাংবাদিকতার পাশাপাশি এ ধরনের সৎ সাংবাদিকতার উদাহরণও যথেষ্ট। সে ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার কর্তব্য পালনে আত্মদানের নজিরও রয়েছে। রয়েছে প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজ দেশের ভ্রান্তনীতি বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রকাশের সাহসী উদাহরণ। পাকিস্তানি সাংবাদিকতায় নির্মোহ, যুক্তিনিষ্ঠ চেতনার প্রকাশ অপেক্ষাকৃত কম। মূলত এ দেশের সাংবাদিক মহলে বাংলাদেশবান্ধব সাংবাদিক হিসেবে কথিত মীর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সত্যান্বেষী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। 
বাংলাদেশকে অপমান করা প্রসঙ্গে অর্থাৎ বাবার সম্মাননা পদক ফেরত দেওয়ার ঘোষণার পক্ষে হামিদ মীর যে কথাগুলো যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন তা ধোপে টেকে না। কারণ হিসেবে তিনি যা বলেছেন তা হলো, তাঁর ধারণা ছিল এ সম্মাননার মাধ্যমে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নত হবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং তা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। কয়েকজন পাকিস্তানিকে সম্মাননা দিয়ে তাদের ধোঁকা দেওয়া হয়েছে। উদ্ভট কথা!
হামিদ মীর সত্যই যদি সত্যসন্ধানী সাংবাদিক হতেন (অন্তত বাংলাদেশ প্রসঙ্গে) তাহলে বিশদ বিশ্লেষণে দেখতে পেতেন যে তাঁর অভিযোগগুলো কতটা যুক্তিহীন। প্রথমত, এ সম্মাননা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছে একাত্তরে তাঁদের সাহসী, সত্যবাদী, মানবতাবাদী, জনবান্ধব ভূমিকার জন্য। অন্য দেশের বেলায়ও একই কথা খাটে। এখানে তিনি সম্মাননার ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর বাবার সুকর্মের জন্য দেওয়া সম্মাননা তাঁর নিজস্ব মতামতের কারণে ফেরত দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই। তৃতীয়ত, ‘সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছানোর’ দায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়, দায় পাকিস্তানের। একাত্তরসহ পুরনো দাবিদাওয়া প্রসঙ্গ যদি বাদও দিই, একাত্তরের যে গণহত্যার জন্য হামিদ মীর পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে আহ্বান জানিয়েছিলেন সেই ঘাতক নিষ্ঠুর স্থানীয় অপরাধীদের বিচার ও দণ্ডবিধানে তাঁর আপত্তি কেন? তিনি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একসুরে কথা বলবেন কেন? পাকিস্তানি পার্লামেন্টে এ বিষয়ে প্রস্তাব গ্রহণের অধিকার যে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির নেই এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল এ সত্য তাঁর মতো ঝানু সাংবাদিকের না জানা, না বোঝার কথা নয়’।
পাকিস্তানের সাথে আমাদের ভৌগোলিক আবহাওয়া, খাদ্য, মন মানসিকতা, সংস্কৃতির সাথে কোনো মিল নাই, ধর্মের ভিত্তিতে বোঝাপড়া কখনো হয়নি, এক সাথে আমরা থাকতে পারিনি, তাই তারা আমাদের চেতনা বুঝতে যাবে কখনো এই আশা করা  মূর্খের স্বর্গে বসবাসের চাইতেও অধিকতর কিছু ।
(নির্বাহী সম্পাদক)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one × three =