সাগর দখলের যুদ্ধে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে পরাজিত চীন:রায় প্রত্যাখ্যান:ক্ষেপণাস্ত্র মহড়া

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে স্বীকৃত দক্ষিণ চীন সাগরের জলসীমা ও তার সম্পদ দখলে রাখতে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি, ক্ষেপনাস্ত্র মহড়া দিয়ে নানান কৌশল নেবার পরও আইনি অধিকার পেলোনা চীন।অধিকৃত এলাকার উপর বেজিংয়ের কোনও ‘ঐতিহাসিক অধিকার’ নেই বলে জানিয়েছে দ্য হেগ-এ জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল। এ পরিস্থিতিতে সাগর দখলের যুদ্ধে যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েছে বেজিং। তবে আদালতের এই  রায় বেজিং মানবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। রায় ঘোষণার আগে থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে মহড়া দিচ্ছে চীন।বরং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘোষণা দিয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরে সক্রিয় থাকবে চীনের যুদ্ধজাহাজ।

১২ জুলাই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার তারিখ আগেই জানানো হয়েছিল। রায় ঘোষণার কয়েক দিন আগে থেকেই দক্ষিণ চীন সাগরের  বিতর্কিত এলাকায় চীনা নৌসেনা মহড়া দিতে শুরু করে। গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং ফ্রিগেট পাঠিয়ে দেওয়া হয় সমুদ্রের যেসব এলাকাকে ফিলিপিন্স নিজেদের জলসীমা বলে দাবি করে, সেখানে। ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে মহড়া দিতে শুরু করে চীন।

আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে চীনের বিরুদ্ধে মামলা করে ফিলিপিন্স। রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, চীনের ঐতিহাসিক অধিকারের কোনও আইনি ভিত্তি নেই। বরং কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করতে গিয়ে প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি করেছে চীন। বেশ কিছু বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীও যথেচ্ছ ভাবে ধরেছেন চীনা ধীবররা।

এদিকে প্রত্যাশিত রায় পেয়ে উচ্ছ্বসিত ফিলিপিন্স ও আমেরিকা। কিন্তু বেজিংকে এই রায় মানতে বাধ্য করানোর মতো কোনও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নেই বলেও মেনে নিচ্ছেন কূটনীতিকরা। চীন মামলায় অংশ নেয়নি। আজ তারা জানিয়ে দিয়েছে, এই পরিস্থিতিকে ভারত পরে কূটনৈতিক ভাবে কাজে লাগাতে পারবে বলেই আশা  করছে সাউথ ব্লক। তাই আপাতত সতর্ক হয়ে এগোতে চাইছে ভারত।
জানা যায়, দীর্ঘ দিন ধরেই দক্ষিণ চীন সাগরে বেজিংয়ের কার্যকলাপ নিয়ে ক্ষুব্ধ আমেরিকা, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম।এলাকাটিকে দখলে রাখতে  বেশ কয়েকটি কৃত্রিম দ্বীপও তৈরি করেছে চীন। আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে স্বীকৃত এই এলাকায় চীনের খবরদারিতে ভারতের স্বার্থেও আঘাত লেগেছে। ফলে আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল ভারত।

সাউথ ব্লক সূত্রে খবর, প্রকাশ্যে এই রায়কে চিন উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই রায়ে মুখ পুড়েছে চীনা সরকারের।

এমন ঘটনা হতে পারে বুঝেই চীন ভারতকে একটি গোপন বার্তাতে জানায়, ভারতের স্বার্থ জড়িত রয়েছে এমন কিছু বিষয়ের ফয়সালা এখন চীনের মত ছাড়া সম্ভব নয়। দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে ভারত আমেরিকার সঙ্গ ছাড়লে চীন সেই বিষয়গুলি বিবেচনা করে দেখবে বলেও ওই বার্তায় ইঙ্গিত দেয়।

সম্প্রতি পারমাণবিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী গোষ্ঠীর (এনএসজি) ভারতে ঢোকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল চীন। সাউথ ব্লক সূত্রের মতে, দক্ষিণ চীন সাগরের বদলে ওই বিষয়টি নিয়েই দর কষাকষি করতে চেয়েছে বেজিং।
তাই চীন সাগর সংক্রান্ত রায় নিয়ে ‘ধীরে চলো’ কৌশল নিয়েছে ভারত।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছে, ভারত রায়টি ‘খতিয়ে দেখছে’। সূত্রে প্রকাশ, এনএসজি-র সদস্যপদের বিষয়টির বদলে এ নিয়ে বেজিংয়ের সঙ্গে দর কষাকষি করতে চায় দিল্লিও। সে জন্যই আপাতত কোনও পক্ষে যোগ দিতে রাজি নয় তারা।

ভারত আগে বেজিংয়ের মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করবে।

China-India Map
 দক্ষিণ চীন সাগরে এখন কী পরিস্থিতি ?
সঙ্ঘাত প্রত্যাশিতই ছিল। ফিলিফিন্স আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়ার পর থেকেই চীন বার বার বলেছে, আদালতের রায়ের পরোয়া বেজিং করবে না। এ পরিস্থিতিতে রায় ঘোষণার পর দক্ষিণ চীন সাগরের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে বলে ওয়াকিবহাল মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল আগেই। হলোও তাই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্তি প্রদর্শন করে ফিলিপিন্সকে চাপে রাখতেই চীনের এই কৌশল। কিন্তু আমেরিকা-সহ গোটা ন্যাটো বাহিনী ফিলিপিন্সের পাশে থাকায়, ম্যানিলাও নতি স্বীকার করছে না।

সঙ্ঘাত কী নিয়ে?
সাধারণত যে কোনও দেশের উপকূল রেখা থেকে সমুদ্রের গভীরে ২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকাকে সেই দেশের নিজস্ব জলসীমা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু, বেজিং‌ গোটা দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশকেই নিজেদের এলাকা বলে দাবি করছে । এতে আন্তর্জাতিক নিয়ম তো লঙ্ঘিত হচ্ছেই পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্বও লঙ্ঘিত হচ্ছে।

চীন সাগরকে ঘিরে যতগুলি দেশ রয়েছে, তার অধিকাংশের সঙ্গেই জলসীমা নিয়ে চিনের বিরোধ রয়েছে। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, ফিলিপিন্স, তাইওয়ান, জাপান— সবক’টি দেশের অধিকারই খর্ব হচ্ছে চীনা আগ্রাসনে। সেখানে জাপান সরাসরি সঙ্ঘাতের পথ বেছে নিয়েছে এবং  ফিলিপিন্স আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয় । হেগ এর ট্রাইব্যুনাল ফিলিপিন্সের পক্ষে রায় দেওয়ায় অন্য দেশও স্বাভাবিক ভাবেই উল্লসিত।

China Sea 001
কোন কোন দেশের সঙ্গে সংঘাত চিনের?
বেজিং দাবি করছে দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশ এলাকা ঐতিহাসিক ভাবে চীনের । এই দাবি যে ঠিক, তা প্রমাণ করতে সমুদ্রের বিভিন্ন এলাকায় তারা কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করা শুরু করে। বেশ কিছু প্রবাল প্রাচীর এবং সমুদ্রের মধ্যে জেগে থাকা কিছু পাথুরে অংশে বালি ফেলে  ছোট ছোট দ্বীপ তৈরি করে চীন। সেই সব দ্বীপে সামরিক পরিকাঠামো এবং রানওয়ে গড়ে তোলে। বসানো হয় মিসাইল লঞ্চারও।

কিন্তু যে সব এলাকায় গিয়ে এই সব কৃত্রিম দ্বীপ চীন গড়ে তুলেছে, তার কোনওটিই চীনা উপকূল রেখার ২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে পড়ে না। তার থেকে অনেক দূরের এলাকা সেসব।

‘প্যারাসেল আইল্যান্ডস’ নামে কৃত্রিম দ্বীপপুঞ্জ চীন তৈরি করেছে, যা নিয়ে চীনের সঙ্গে ভিয়েতনামের বিরোধ চলছে।

স্কারবোরো শোয়াল নিয়ে বিরোধ চলছে তাইওয়ানের সঙ্গে।

ফিলিপিন্সের উপকূলের গা ঘেঁষে তৈরি করা ‘স্প্র্যাটলি আইল্যান্ডস’ নিয়ে চীনের বিরোধ চলছে ফিলিপিন্সের সঙ্গে। সেই মামলার রায়ই ঘোষিত হল গতকাল ১২ জুলাই।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × 1 =