সাতচল্লিশ -বায়ান্ন -একাত্তর এবং আহমদ রফিক

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

আহমদ রফিক- জীবন, মানুষ, প্রকৃতি, সমাজ, রাষ্ট্র; এইসব শব্দের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত একটি নাম। দেখেছেন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ।

ভাষা আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধের শুধু প্রত্যক্ষদর্শীই নন; বরং ঘনিষ্ঠভাবে অংশগ্রহণকারীদের অন্যতম।

কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট এবং ভাষাসৈনিক আহমদ রফিকের জন্ম ১৯২৯ সালে। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতির টানে সমভাবে আলোড়িত ছিলেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার সময় থেকেই তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন সাহিত্যচর্চা এবং ছাত্ররাজনীতির সাথে। বিভিন্ন প্রগতিবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি অংশ নিয়েছিলেন ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনেও। যে আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন একজন লড়াকু সৈনিকের ভূমিকায়। তাঁর রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আহমদ রফিক বলেন—‘আমি স্কুলজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তখনকার ছাত্ররাজনীতি অবশ্য ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি ছিল না।

ছাত্ররাজনীতি মানেই আদর্শের জায়গা। দেশপ্রেম। স্কুল ও কলেজ-জীবনে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সেই ধারাবাহিকতায় মেডিকেল কলেজে এসেও ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ সেই সময়ে প্রগতিশীল রাজনীতির ঘাঁটি ছিল। যখন ভাষা আন্দোলনের প্রশ্ন এলো, তখন নিজে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সংগঠিত করেছি। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-সব হলে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির আড্ডা ছিল, সেখানেও যোগাযোগ রেখেছি। আমাদের হোস্টেলে পোস্টার ও লিফলেট দিয়ে ছাত্র-জনমত তৈরির কাজে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত ছিলাম। প্রতিটি মিছিল, সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছি। ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সভায়ও উপস্থিত ছিলাম। ভাষা আন্দোলনের সময় আমি মেডিকেল কলেজে একজন সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছি।’

’৫২-র ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও আহমদ রফিক একজন নিভৃতচারী কবি। বাংলা সাহিত্যে রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার জন্য যেমন সশরীরে মাঠে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তেমনি বাংলাসাহিত্যের সমৃদ্ধিতেও তাঁর কবিতা প্রবন্ধ এবং সম্পাদনা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে তাঁর রবীন্দ্রবিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজের জন্য কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাঁকে ’রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য ’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।

ভাষা আন্দোলন বায়ান্নতেই শুরু হয়নি
একটি জাতির প্রকাশ এবং বিকাশের মাধ্যম তার ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি। তাই যুগে যুুগে আধিপত্য বিস্তারকারী শোসকগোষ্ঠী কোনো জাতিকে দমিয়ে রাখার জন্য প্রথমে তার সংস্কৃতিকে রুখে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানও তাদের অপরাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য প্রথমে এদেশের ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল।

‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে যদিও সৈয়দ মুজতবা আলী তখনই লিখেছিলেন—“…আরব ও ইরানের ‘পারস্যের’ মানচিত্রের দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন যে এ দু’দেশের মাঝখানে কোনো তৃতীয় দেশ নেই। … উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ও যেখানে আরবী ভাষা শেষ হয়েছে সেখান থেকেই তুর্কী ভাষা আরম্ভ হয়েছে। সকলেই জানেন খলিফা আবুবকরের আমলে মুসলিম আরবেরা অমুসলিম ইরান দখল করে।…

কোনো সন্দেহ নেই যে আরবী ভাষা যে কোনো কারণেই হোক দেশের আপামর জনসাধারণকে তৃপ্ত করতে পারেনি বলেই ফার্সির অভ্যুত্থান হল। তারপর একদিন ফার্সি ইরানের রাষ্ট্রভাষা হয়ে গেল।” সৈয়দ মুজতবা আলীর পুরো লেখাটিতে ধারণা দেয়া হয় যে ভাষার ওপর কোনো অজুহাতেই জোর চলে না। এবং এই ইতিহাস পশ্চিম পাকিস্তানেরও জানার বাইরে থাকার কথা নয়। তারা জেনেশুনেই তাদের স্বেচ্ছাচারিতা করেছিল বাঙালির ওপরে। সেই আক্রমণ শুধু ভাষার উদ্দেশে যেমন ছিল না, তেমনি বাঙালির মাতৃভাষা আন্দোলনও শুধুই রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর আগে পরের অনেক হিসাব ছিল যা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক আহমদ রফিক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “বায়ান্ন সালে আমরা হঠাত্ আন্দোলন করলাম আর ভাষা প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে তা নয়। এসব বিষয়ে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হবে। অর্থাত্ ৫২-র আগে। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বলতে গেলে বলতে হয় যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হয়, তখন ১৯৪৭ সালের মে মাসে মুসলিম লীগের নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান বললেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। তখন কলকাতায় ইত্তেহাদ ও আজাদ পত্রিকায় আব্দুল হক সাহেব ও জাহেদী প্রমুখ বাংলা ভাষার পক্ষে প্রবন্ধ লেখেন। আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর গণআজাদী লীগ, যুবলীগ, তমদ্দুন মজলিস বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলতে শুরু করে। এসময় সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ডাক, রেলসহ বিভিন্ন কাগজপত্রে উর্দু ভাষার ব্যবহার শুরু করে। তখন এর প্রতিবাদ করেছিল তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা। পরে ’৪৮ সালের আন্দোলন, সেটাও সবারই জানা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদে কেবল রাষ্ট্রভাষাই নয়, উর্দু ও ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের ব্যবহারিক ভাষা করার দাবি জানান। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বললেন, এটা মুসলিম দেশ, তাই উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। নাজিম উদ্দিন ও নুরুল আমিন এই কথা সমর্থন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৮ সালের মার্চে আন্দোলন শুরু হয়। যে আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিস এবং সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের একটা বড় অংশ মাঝপথে যুক্ত হয়ে আন্দোলন স্থগিত করে। এই আন্দোলন স্থগিত করে একটা মহা অন্যায় করে তারা। ১৯৪৮ থেকে ’৫১ পর্যন্ত সময়টা খুব খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে কেটেছে। এই সময় বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছে। আবার আন্দোলনের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে। গণপরিষদের সব সদস্যের কাছে স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিম উদ্দিন পল্টন ময়দানের জনসভায় বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। ৩১ জানুয়ারি বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় সরকারবিরোধী সব দল, ছাত্রাবাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে। পরে ৪ ফেব্রুয়ারি আমতলার কলাভবনের বৈঠকে ঠিক করা হয় ২১ ফেব্রুয়ারি বাজেট অধিবেশন বসবে, সেদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সভা-সমাবেশ হবে। এই সভা-সমাবেশের প্রস্তুতি দেখে পাকিস্তান সরকার ভয় পায়। ২০ ফেব্রুয়ারি বিকালে ঘোড়ার গাড়িতে করে ঘোষণা দেওয়া হয় ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে মাসব্যাপী ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ। এটা ছাত্রদের ভীষণভাবে উত্তেজিত করল। এসময়ে সাধারণ ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভাঙার ঘোষণা দিল। ছাত্ররা বলল, একুশের যে কর্মসূচি আছে সেগুলো পালন করা হবে। এই পরিস্থিতিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ওই দিন রাতে সভা করে সিদ্ধান্ত নিল সরকারের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া ঠিক হবে না। এই সভায় সংগ্রাম পরিষদের কাজী গোলাম মাহবুব, এস এম হলের হেদায়েত হোসেনসহ অন্য ছাত্রনেতারাও ছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতে আবদুল মতিন, অলি আহাদ ও মেডিকেল কলেজের গোলাম মাওলা প্রতিবাদ করলেন যে, না সাধারণ ছাত্ররা এটা চায় না। অতএব ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলায় যে সিদ্ধান্ত হবে সেটাই চূড়ান্ত। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা এতটাই উত্তেজিত ছিল, আমতলার সেই সভায় শামসুল হক সাহেব সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছিলেন। এ সময়ে তাঁর কথা ছাত্ররা শুনতে চায়নি। শুনতে চাইল না বলেই পরে আবদুল মতিন সাহেব বক্তৃতায় বললেন, ‘১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।’ আমি বরাবরই বলি ১৪৪ ধারা না ভাঙলে যেমন একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন সফল হতো না, তেমনি গুলি না চালালে আমরা আজ ‘একুশে’ পেতাম না।”

প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি এবং সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার ফলে আহমদ রফিকের লেখার ভাষাটি অত্যন্ত সাবলীল। যেকোনো কঠিন এবং গভীর বিষয়ের সহজ উপস্থাপনাই যেন তাঁর ভাষার অলংকরণ। তাঁর গদ্যে পাঠক সহজেই প্রবেশের আমন্ত্রণ পেয়ে যান। যে কারণে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, রাষ্ট্রচিন্তা এবং গভীর জীবনদর্শনকে আহমদ রফিক বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। রবীন্দ্রনাথের বাউলচেতনা, স্বদেশভাবনা এবং সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজবাদ বিষয়ক মতামত থেকে বিশ্বশান্তির প্রবক্তা এবং ইউরোপ এশিয়ার দ্বন্দ্বে এশীয় ঐক্যের প্রবক্তা রবীন্দ্রনাথের বিশ্বদর্শনও আহমদ রফিক তুলে ধরেছেন তাঁর প্রবন্ধে। পাকিস্তানের কাছ থেকে বাঙালির ওপরে আসা বড় সাংস্কৃতিক আক্রমণ ছিল রবীন্দ্রসাহিত্য বর্জন করার চাপ। রবীন্দ্রনাথ আর বাঙালি সংস্কৃতির সম্পর্ক এবং রবীন্দ্রনাথের প্রয়োজনীয়তা আহমদ রফিক দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরে এই আক্রমণকে প্রতিহত করার কাজটি সফলভাবে করেছেন। সমাজচিন্তা, গ্রাম উন্নয়ন থেকে জীবন জিজ্ঞাসার অনেক উত্তর যে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে রয়েছে সেটি আহমদ রফিক বুঝেছিলেন এবং এখানকার বাঙালিদের বোঝানোর দায়িত্বটি পালন করেছেন। রবীন্দ্রনাথকে কবি আহমদ রফিক কতটা ধারণ করতে পেরেছেন তা তাঁর ‘প্রতিদিন পঁচিশে বৈশাখ’ শিরোনামের কবিতা থেকে উপলব্ধি করা যাক—

“তোমার প্রত্যয় গড়া সামূহিক বিশাল স্থাপত্য/কিংবা ‘টেরাকোটা’র মতো অসামান্য/কারুকাজে রূপময় সৃষ্টির বাহার/ঐতিহ্যের অনন্য ঠিকানা।/ভাবে ও বস্তুতে মেশা স্থিররূপে নিহিত ইঙ্গিত/মাটি ও মনন ছুঁয়ে একসাথে/পরিব্যাপ্ত শিকড়ে সত্তায়/জীবনের প্রকাশ ঘটায়।/নিত্যদিন তাই নিয়ে আমাদের পথ চলা/ নিত্য নব পথের সন্ধানে,/শুধু নয় একদিন পঁচিশে বৈশাখে—/সেই চলা দিন দিন/প্রতিটি দিনের/পঁচিশে বৈশাখে।”

সাহিত্যের দশক বিভাজন নিয়ে ‘বাংলাদেশের কবিতা : দশকভাঙা বিচার’ নামে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ রয়েছে। এছাড়াও সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয়ে ‘শিল্প সংস্কৃতি জীবন’, ‘নজরুল কাব্যে জীবনসাধনা’, ‘আরেক কালান্তর’, ‘বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি’, ‘ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাত্পর্য’, ‘ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা’ ‘জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা : বাঙালি বাংলাদেশ’ এবং একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘অনেক রঙের আকাশ’সহ বিভিন্ন বিষয়ে আহমদ রফিকের গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রবন্ধগ্রন্থ রয়েছে। রয়েছে নয়টি কাব্যগ্রন্থ। অনুবাদও করেছেন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের। নিয়মিত লিখছেন সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে। তাঁর সকল প্রবন্ধের মধ্যে রবীন্দ্র সম্পর্কিত লেখাগুলোর আলাদা মাত্রা আছে। যা তাঁকে প্রবন্ধসাহিত্যের ক্ষেত্রে অনন্য উচ্চতায় রেখেছে। এখনো রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর অভিমত—‘উগ্র জাতীয়তাবাদের তিনি ঘোর বিরোধী। তাই যতটা তিনি স্বদেশপ্রেমী, তুলনায় কিছুটা বেশি মাত্রায় বিশ্বপ্রেমী। সেদিক দিয়ে বিচারে তিনি আন্তর্জাতিকতাবাদী, যেমন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তেমনি সাহিত্য সংস্কৃতিতে। এসব ক্ষেত্রে মানবিক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ তাঁর প্রধান প্রেরণা। এমন সব বিচারেই বোধ হয় তাঁর স্বদেশী প্রগতিবাদীরা, এমনকি গণতন্ত্রীরা তাঁকে আখ্যায়িত করেছেন ‘বিশ্বনাগরিক’, ‘বিশ্বকবি’ ইত্যাদি পরিচয়ে।’
ইচ্ছামতীর ঘরে, ভালোবাসা ভালো নেই
এই দুটো বইয়ের নাম একটি বাক্য হয়ে এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরতে পারে, ­যা থেকে কবি আহমদ রফিককে ব্যাখ্যা করার আগ্রহ আরও বেড়ে যাবে। আসলেই তো ভালোবাসা ভালো নেই। মানুষের নেই জীবনের কাছে একটু দাঁড়াবার সময়। সময় নেই নিজেকে দেখার, নিজেকে বোঝার; তাই হয়তো আমরা প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। প্রকৃতিও আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আহমদ রফিক অত্যন্ত সমাজসচেতন এবং জীবনঘনিষ্ঠ কবি। তাঁর কবিতায় সমাজ রাজনীতির নানান সময়ের বাস্তবতা উঠে এসেছে। উঠে এসেছে শান্ত জীবন ও প্রকৃতিছোঁয়া নারী, নারীর প্রেম। পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ থেকে ষাটের দশকের প্রথম দিকে তাঁর লেখা কবিতার মুখ্য বিষয় ছিল উঠতি শহর এবং নাগরিক মনের সঙ্গে বাউলমনা প্রকৃতির মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব। তবে বাংলার মাটি মানুষ এবং নিসর্গের প্রতি পরম মমতা থাকলেও এই দ্বন্দ্বে কবি নগর বা প্রকৃতি কোনোটিরই পক্ষে-বিপক্ষে নন। আহমদ রফিক তাঁর কবিতায় আধুনিক মনন আর বাস্তবতার টানাপড়েন দেখিয়েছেন। যেখান থেকে জীবনজিজ্ঞাসার অনেক প্রশ্ন উঠে আসে। আবার একাত্তরে এসে পরিস্থিতি আহমদ রফিকের কবিতার উচ্চারণ পাল্টে দেয়। তিনি হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর প্রতিবাদী, তখন লেখেন ‘রক্তের নিসর্গে স্বদেশ’। সেই দেশভাগ থেকে শুরু করে ’৫২, ’৭১ হয়ে এখনো পর্যন্ত আহমদ রফিক এই সমাজ এবং মানুষের মাঝে নিজেকে কবিতায় চাষ করে যাচ্ছেন। তাঁর কবিতার বইয়ের নাম এবং বিষয় পড়লেই সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়। প্রত্যেকটি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ঠিক ওই সময়ের সমাজ রাজনীতির ছোঁয়া লেগে আছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসিত নায়ক’ (১৯৬৬), দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বাউল মাটিতে মন’ (১৯৭০)। এরপরে ষাটের শেষে এবং সত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা কবিতা ‘রক্তের নিসর্গে স্বদেশ’ (১৯৭৯) প্রকাশিত হয়। পর্যায়ক্রমে সবক’টি বইয়ের পেছনেই সমাজ-বাস্তবতার গভীর ক্ষত খুঁজে পাওয়া যায়। আহমদ রফিকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নির্বাসিত নায়ক’ সম্পর্কে কবি প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘কবিতাগুলো পড়ে এতটা মুগ্ধ হয়েছি যে অনেকদিন বাঙলা কবিতা পড়ে এতটা মুগ্ধ হয়েছি বলে মনে পড়ে না।’।

ভাষা সৈনিক প্রাবন্ধিক এবং রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ অভিধায় প্রায় ঢাকা পড়ে যাওয়া কবি আহমদ রফিক বলেন—‘কবিতা লেখা পঞ্চাশের দশক থেকে প্রবন্ধের পাশাপাশি। তবে ফাঁকে-ফোকরে যখন মন চেয়েছে। কবিতার কলমে তাই ধীরগতি, কিন্তু বক্তব্য এবং মতামত প্রকাশের প্রবল তাগিদে প্রবন্ধ চলেছে জোর কদমে।’ আহমদ রফিকের কবিতায় নানা বিষয় উঠে আসলেও নিভৃত জীবনের মৌন কলরবই যেন বেশি কাব্যময়তা ধারণে সক্ষম হয়েছে। তাঁর ‘ইচ্ছামতীর ঘরে’ কাব্যগ্রন্থের ‘ঘুম আসার আগে’ শিরোনামের কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘তবু পাতা ঝরে বাতাসের গা’য়/ কোথাকার রূপ কোথায় হারায়,/ জীবন জানে তার হার জিত্/ ঘুম যদি আসে, আছি অপেক্ষায়।’

জীবনের কোনো বয়সই তাঁর লেখায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে এখনো সমান তালে লিখে চলেছেন। লেখার বেলায় কোনো ক্লান্তিকেই তিনি প্রশ্রয় দেননি। বরাবরই একজন প্রতিবাদী মানুষ হিসেবে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। মৌলবাদ ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি একাধিকবার তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা করেছে। তবে সমাজ প্রগতির সংগ্রাম থেকে কখনো তাঁকে থামিয়ে রাখা যায়নি। যে-জন্য মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক-সহ অসংখ্য পদক ও সম্মাননা। ( দৈনিক ইত্তেফাক)

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × 1 =