সিআইএ’র প্রথম নারী পরিচালক ‘নিষ্ঠুর নির্যাতনের কারিগর’ খ্যাত গিনা হ্যাসপাল

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার ‌(সিআইএ) প্রথম নারী পরিচালক হিসেবে গিনা হাসপেলকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মার্কিন সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিআইএ’র  প্রধান হিসেবে তার নিয়োগ অনুমোদন করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে নির্মম ওয়াটারবোর্ডিং কৌশল

বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে, সিনেটের ১০০ সদস্যের মধ্যে ৫৪ জন গিনার পক্ষে এবং ৪৫ জন বিপক্ষে ভোট দেন। এরমধ্যে ডেমোক্রেট দলের ছয়জন সিনেটর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত এ নিয়োগের পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির দুই সিনেটর গিনার বিপক্ষে ভোট দেন। তারা মূলত রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গিনার নিয়োগের বিরোধিতা করেন। ম্যাককেইন ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী আছেন। এ কারণে তিনি ভোটদানে অংশ নিতে পারেননি।

৩৩ বছর ধরে সিআইএ’তে কাজ করা দক্ষ গোয়েন্দা হাসপেল তার পূর্বসুরী মাইক পম্পেওর স্থলাভিষিক্ত হবেন। গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পম্পেওর নিয়োগ চূড়ান্ত হলে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন হাসপেল।

সিআইএ’র প্রথম নারী পরিচালক হিসেবে গিনা হ্যাসপালের নিয়োগকে অনেকে ট্রাম্পের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন্। কিন্তু ম্যাককেইন মনে করেন, গিনাকে সিআইএর পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত করা ভুল সিদ্ধান্ত। আর গিনার অন্ধকার দিকগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করলে একজন নারী হিসেবে তার এই ঐতিহাসিক নিয়োগের আলোকিত অধ্যায়টি কালো মেঘে ঢেকে যায়।

বন্দিদের ‘নিষ্ঠুর নির্যাতনের কারিগর’ খ্যাত গিনা হ্যাসপাল ১৯৮৫ সালে সিআইএ’তে যোগ দিয়ে সংস্থার হয়ে প্রায় ২০টি আলাদা ধরনের কাজ করেছেন তিনি। দেশের বাইরেও সংস্থার হয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তবে ৬১ বছর বয়সী জিনা হ্যাসপেল সিআইএর কর্মকর্তা হিসেবে ৩৩ বছরের ক্যারিয়ারে দেশের বাইরে অনেক গোপন অভিযানেও অংশ নেন তিনি। গিনা লন্ডনের সিআইএর শীর্ষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি সংস্থাটির গোপন অভিযানের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন।

গিনা  সিআইএর এমন কর্মকর্তা, যিনি ২০০১ সালের ঐতিহাসিক নাইন ইলেভেনের পর মুসলমানদের গোপন কারাগারে নিয়ে নিষ্ঠুরতম নির্যাতনের বিভিন্ন কলাকৌশল উদ্ভাবন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের এমন এক গোপন কারাগার ছিল থাইল্যান্ডে। যেখানকার নিষ্ঠুরতার কালো অধ্যায়টি সরাসরি দেখভাল করতেন এই গিনা। ওই কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদের নামে কঠোর নির্যাতন করা হতো।

২০০২ সালে কারাগারটি পরিচালনা করেন গিনা। ওই সময় বিভিন্ন মানুষকে সন্দেহভাজন হিসেবে ভয়ঙ্কর নির্যাতন করা হয়েছিল। থাই কারাগারে গিনার তত্ত্বাবধানের অন্তত দুই সন্দেহভাজন আল কায়েদা সদস্যকে নির্মম ওয়াটারবোর্ডিং কৌশল প্রয়োগ করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। এই পদ্ধতিতে লোকজনের চোখেমুখে কাপড় পেঁচিয়ে তার ওপর পানি ঢালা হয়। এতে ওই ব্যক্তির পানিতে ডুবে যাওয়ার অনুভূতি হয়।

নির্বাচনী প্রচার ও জয়ী হওয়ার পর ট্রাম্প কয়েকবার ওয়াটারবোর্ডিংসহ অন্যান্য নির্যাতন সমর্থন করেন বলে মত দিয়েছিলেন। ল্যারি সিয়ামস ‘টর্চার রিপোর্ট’ নামে একটি বই লিখেছেন। যাতে তিনি ৯/১১ হামলার পর সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের জিজ্ঞাসাবাদে যে নিষ্ঠুর ও অকার্যকর কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল, তা তুলে ধরেছেন।

গিনাকে সিআইএপ্রধান হিসেবে ট্রাম্প নিয়োগ দানের পর ল্যারি বলেছিলেন, ঘটনা হচ্ছে- গিনা সংস্থাটিতে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছেন। এটির ভেতরে তিনি বেড়ে উঠেছেন। এখন তিনি সেটির পরিচালক হচ্ছেন, যা সত্যিই উদ্বেগের।

বছর তিনেক আগে দেশটির সিনেট গোয়েন্দা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএর গোপন কারাগারে নির্যাতনের যে কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে নিষ্ঠুর ছিল। বিশেষ করে বন্দিদের পায়ুপথে পাইপ বসিয়ে খাবার ও পানীয় ঢোকানো হতো। এভাবেই তাদের খাওয়ানো হতো। বন্দিরা অনশন ধর্মঘট করলে তাদের নির্যাতনে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো। কখনও কখনও বন্দিদের দিনের পর দিন ঘুম থেকে বঞ্চিত করা হতো। তাদের পুরো সপ্তাহেও একটু ঘুমাতে দেয়া হতো না। কারাগারে আটকদের স্বজনদের হুমকি-ধমকি দেয়া হতো।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দিদের জন্য একটি খাবার ট্রেতে করে সস, বাদাম ও কিশমিশসহ পাস্তা নিয়ে আসা হয়। এ ছাড়া আরও খাবার ছিল, যা পাইপ দিয়ে বন্দিদের পায়ুপথে প্রবেশ করানো হয়েছিল। সিআইএ কর্মকর্তারা বন্দিদের সামনে তাদের শিশুদের এনে আঘাত করত। যৌন নির্যাতন করা হতো। এক বন্দির মায়ের গলা কেটে ফেলা হয়েছিল।

ওয়াশিংটনে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের উপপরিচালক ক্রিস্টোফার অ্যান্ডার্স বলেন, গিনার চিন্তাভাবনায় নির্যাতন ছাড়া আর কিছু নেই।

গিনাকে সিআইএপ্রধান হিসেবে নিয়োগদানের পর সিনেটর জন ম্যাককেইনও বলেছিলেন, গিনা কী ধরনের নির্যাতন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তার মাত্রা কী পরিমাণ ছিল, সিনেটে মনোনয়ন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার সময় তার সেটি বর্ণনা করা প্রয়োজন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিদের নির্যাতনকে মার্কিন ইতিহাসের এক অন্ধকারময় অধ্যায় আখ্যা দেন ম্যাককেইন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 × 5 =