স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষের লাশ উদ্ধার- এসপির সংবাদ সম্মেলন

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

নিখোঁজের ২২ দিন পর স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষের লাশ উদ্ধার ! সোমবার রাত ১১টায় নারায়ণগঞ্জ শহরের আমলপাড়া এলাকার ঠান্ডু মিয়ার ৪ তলা ভবনের সেপটি ট্যাংক থেকে ওই লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ইতিমধ্যে লাশ পঁচে গলে গেছে।

প্রবীর চন্দ্র ঘোষের নিখোঁজের ঘটনায় বাবা ভোলানাথ ঘোষ বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জিডি করেন। ওই জিডির তদন্ত পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে দেয়া হয়। ডিবি পুলিশ বিষয়টির তদন্ত করে পিন্টু ও বাবু নামের দুইজনকে আটক করে। তার মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু স্বীকার করে প্রবীর ঘোষের বিষয়টি। পরে তার দেখানো মতেই সোমবার রাতে শহরের আমলপাড়া এলাকার ঠান্ডু মিয়ার ভবনের সেফটিক ট্যাংক থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। কয়েকটি ব্যাগে করে ট্যাংকিতে লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির এস আই মফিজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন !

প্রবীর চন্দ্র ঘোষ নারায়ণগঞ্জ কালীরবাজার ভোলানাথ জুয়েলার্সের মালিক। গত ১৮ জুন রাত সাড়ে ৯টায় নগরীর বালুর মাঠের বাসা থেকে কালিরবাজার এসে নিখোঁজ হন স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর চন্দ্র ঘোষ। ঐ রাতেই পিন্টুর ফ্লাটে হত্যা করা হয় তাকে। হত্যার পর কালীরবাজার স্বর্ণ পট্টির পিন্টু স্বর্ণ শিল্পালয়ের মালিক পিন্টু তার কর্মচারী বাপন ভৌমিক ওরফে বাবুকে তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চন্দনপুর পাঠিয়ে দেয়। প্রবীর ঘোষের মোবাইল ফোনটি সঙ্গে দিয়ে পিন্টু বলে দেয় সীমান্ত এলাকায় যেয়ে প্রবীরের ছোট ভাই বিপ্লবের মোবাইলে একটি মেসেজ দিয়ে মোবাইল ফোন ও সিম কার্ডটি ফেলে দিতে। পিন্টুর কথামত প্রবীর ঘোষের মোবাইল থেকে ছোট ভাই বিপ্লবের মোবাইলে ২১ জুন একটি ম্যাসেজ দেয় বাপন । যাতে সে বলে, তাকে কালীর বাজারের অনেক বড় বড় রাঘব বোয়ালরা অপহরন করেছে। বাঁচাতে হলে ১ কোটি টাকা মুক্তিপন দিতে হবে। মুক্তিপনের টাকা ঢাকার হানিফ ফ্লাইওভারে নিয়ে আসতে হবে। ম্যাসেজটি দেয়ার পরপরই বাপন মোবাইল থেকে সিম কার্ডটি বের করে ফেলে দেয়। মোবাইল সেটটি তার কাছে রেখে দেয়। এদিকে বিপ্লবের মোবাইলে ম্যাসেজ আসার পর পুলিশকে জানালে পুলিশ ম্যাসেজের উত্তরে পাঠায়। যাতে বলা হয় কখন এবং ফ্লাইওভারের কোন জায়গায় টাকা নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু পরবর্তিতে পুলিশের দেয়া সেই ম্যাসেজের আর কোন উত্তর আসেনি। বাপন ম্যাসেজটি দিয়ে প্রবীরের সিম কার্ডটি ফেলে মোবাইল সেটটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসে। নারায়ণগঞ্জে ফিরে এসে সে তার কাছে মোবাইল ফোনটি রেখে দেয়।

গত ৭ জুন শনিবার সকালে বাপন প্রবীরের মোবাইল সেটটিতে তার নিজের সিম কার্ড ভরে কথপোকথন শুরু করে। মোবাইল সেটটি চালু করার সঙ্গে সঙ্গেই ডিবি পুলিশ আইএমই নাম্বার ট্রাক করে শনিবার রাতে বাপনকে গ্রেফতার করে। পরদিন ৮ জুন রোববার সকালে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে প্রবীর ঘোষের ঘনিষ্ট বন্ধু পিন্টু দেবনাথকে। দীর্ঘ সময় পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের। সোমবার রাত ৮টায় পিন্টু দেবনাথ ও বাপন ভৌমিক জানায়, প্রবীর ঘোষের লাশ আমলাপাড়ার ১৫ কে সি নাগ রোডের রাশেদুল ইসলাম ওরফে ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির সেপটিক ট্যাংকে রয়েছে। এ তথ্য পাওয়ার পরপরই সাদা পোষাকে পুলিশ বাড়িটির চারিপাশে অবস্থান নেয়। রাত ১১টায় পুলিশ সঙ্গে ডোম নিয়ে সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে তল্লাশি অভিযান শুরু করে। উদ্ধার করা হয় ৩টি প্লাষ্টিকের ব্যাগে ৫ টুকরা প্রবীর ঘোষের লাশ। তবে দু’পায়ের হাটুর নি¤œাংশ পাওয়া যায়নি।

এসপির সংবাদ সম্মেলন

স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ মূলত আর্থিক লেনদনের বিরোধের কারণেই খুন হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। আর এ নৃশংস হত্যাকান্ডে জড়িত প্রবীরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পিন্টু দেবনাথ ও তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিক বাবু।
প্রবীর ঘোষের এক ভাই সৌমির ঘোষ ইতালী প্রবাসী। সেখান থেকে মোটা অংকের টাকা পাঠানো হয় প্রবীর ঘোষের কাছে। দীর্ঘদিন ধরে ওই টাকা লেনদেন হতো প্রবীর ও পিন্টুর মধ্যে। সম্প্রতি সৌমিক ঘোষ যখন দেশে আসেন তখন থেকেই নিখোঁজ ছিল প্রবীর। সৌমিক দেশে আসার আগেই টাকার জন্য পিন্টুকে চাপ দিতে থাকে প্রবীর। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। পরে পরিকল্পনা করেই প্রবীরকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে পিন্টু ও তার দোকানের কর্মচারী বাপেন ভৌমিক। প্রাথমিকভাবে এও ধারণা করা হচ্ছে পিন্টু যে বাসাতে থাকে সে বাসার ফ্লাটেই প্রবীরকে হত্যার পর ওই বাসার নিচে সেপটিক ট্যাংকে লাশ ব্যাগে করে ফেলে দেওয়া হয়।

মূলত প্রযুক্তি ব্যবহার করেই বাপেন ও পিন্টুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কী কী কারণে প্রবীরকে হত্যা করা হয়েছে তার আরো আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা চলছে।
১০ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মঈনুল হক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূরে আলম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শরফুদ্দিন প্রমুখ।

নিহত প্রবীর ঘোষের ছোট ভাইয়ের বক্তব্য
প্রবীর ঘোষের ছোট ভাই বিপ্লব বলেন, আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর খুনীরা তাকে খোঁজার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যায়। আমরা ঘুর্নাক্ষরেও টের পাইনি এরাই খুনী। অথচ এই খুনীরা আমাদের প্রতিদিনই সমবেদনার বাণী শুনিয়ে আসছিল।

নিহত প্রবীর ঘোষের পরিবারের বক্তব্য
কিছু দিন আগে ভারতের কলকাতায় প্রবীর ঘোষের বন্ধু পিন্টু দেবনাথের ওপেন হার্ট সার্জারী হয়। এই প্রবীর ঘোষই ভারতে পিন্টুর চিকিৎসার জন্য সকল সহযোগিতা করে। প্রবীর ঘোষের  এক ভাই সৌমির ঘোষ দীর্ঘদিন থেকে ইটালীতে অবস্থান করছে। ওই ভাইয়ের দেয়া টাকা নিয়েই প্রবীর ও পিন্টু স্বর্ণ ও সুদের ব্যবসা করছিলেন। এই টাকার একটি বিশাল অংশ পিন্টুর কাছে গচ্ছিত রয়েছে। প্রবীর এ টাকার জন্য কিছুদিন ধরে পিন্টুকে চাপ দিয়ে আসছিল। সৌমির ঘোষ দেশে আসার পরই প্রবীর নিখোজ হয়।

স্বর্ণ ব্যবসায়ী মার্কেট সমিতির সভাপতির বক্তব্য
সভাপতি সঙ্কর ঘোষ বলেন, ওরা দুজন মিলে হত্যা করেনি। এই হত্যার পেছনে অন্য কারো হাত আছে। আমরা চাই, হত্যার রহস্য উন্মোচন করে হত্যাকারী এবং হত্যার পরিকল্পনাকারী সকলের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডদেয়া হোক।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 + seventeen =