হাওরে এবার ধানের বাম্পার ফলন: প্রধানমন্ত্রীর সময়োচিত পদক্ষেপের ফসল

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

হাওরের কৃষকদের জন্য বিগত দু’বছর ফসলহীন চরম আকাল  ছিল। এ বছর কৃষাণ কৃষানীরা কষ্ট ভুলে দিনরাত আনন্দে মাতোয়ারা। তারা ঘরে তুলছে নতুন ধান।ধানের মৌ মৌ গন্ধে মধুময় এখন হাওরের বাতাস। এখানে এখন ধান কাটা ও মাড়াই কাজের ধুম পড়েছে। চারিদিক কৃষকের কন্ঠে আনন্দের গানে মুখরিত। গাঁয়ে গাঁয়ে সোনার ফসল গোলায় তোলা হচ্ছে। হাওরের মানুষের বোরো ফসল একমাত্র ভরসা। এ বছর এখনো উজান থেকে পাহাড়ী ঢল নামেনি। আবহাওয়া রয়েছে অনুকূলে। বিরামহীন ধানকাটা চলছে। প্রধানমন্ত্রী এক বছর আগে হাওর পরিদর্শন শেষে হাওরে বন্যার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার নির্দেশ দেন ।

মোহনগঞ্জের কৃষকরা জানায়, এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। সামনে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে তাদের অনটন ঘুচে যাবে। খাদ্য উদ্বৃত্ত এই এলাকার কৃষকরা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমান ধান রপ্তানি করে তাদের দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী হাওরের বন্যাপীড়িত কৃষকদের পরিদর্শন করে ত্রাণ বিতরণ করেন ৩০ এপ্রিল ২০১৭

 

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে ১৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আবাদ হয়েছে ১৭ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে। হাওর ঘুরে দেখা গেছে ধান আর ধান।
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন ১লা বৈশাখ দুপুরে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরে বোরো ধান কাটার সময় সেখানে উপস্থিত হন উপজেলা জেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মেহেদী মাহমুদ আকন্দ ও পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আক্তারুজ্জামান। মোহনগঞ্জ উপজেলা প্রসাশন ও নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সাংবাদিকরা। তারা বর্গাচাষীদের সঙ্গে ধান কাটার আনন্দ ভাগ করে নেন। এ সময় প্রশাসনের থেকে ডিঙ্গাপোতা হাওরে ধানকাটার কাজে কর্মরত কৃষক ও বর্গা চাষীদের মাঝে লুঙ্গি, গেঞ্জি ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।

৩০ এপ্রিল ২০১৭ অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে রোববার সুনামগঞ্জের শাল্লায় এক সমাবেশে  প্রদানমন্ত্রী  বলেন, “কারও যদি কোনো গাফলতি থাকে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।”
বন্যায় ফসলহানীর সুযোগ নিয়ে কেউ যদি দেশের বাজারে খাদ্যশষ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নগদ সহায়তার পাশাপাশি আগামী মওসুমের জন্য বিনামূল্যে বীজ আর সার দেয়ার নি্দেশ ও দেন।  সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন , মৎস্যজীবী ও কৃষকদের ঋণের সুদের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে। গোখাদ্যের যেন অভাব যেন না হয়, সে ব্যবস্থাও সরকার নেবে। “একটা লোককে না খেয়ে মরতে দেব না। যা করার করব,” বলেছিলেন শেখ হাসিনা।
২০১৭ সালের মার্চের শেষ দিকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা তালিয়ে যায়। দুর্বল ও অসমাপ্ত বাঁধ ভেঙে প্লাবন ও ফসলহানির পেছনে বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকে দায়ী করে ঢাকায় মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশ হয়।
বোরো ধান কাটার মওসুমে হঠাৎ বন্যায় লাখ লাখ কৃষকের মাথায় হাত পড়ে। এরপর পানি বিষাক্ত হলে মাছ মরা শুরু হয়; তারপর মরতে থাকে হাঁস। পরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রতিনিধি দল  এলাকা ঘুরে পানি পরীক্ষা করে বলেন, প্রাথমিকভাবে ইউরেনিয়াম তেজস্ক্রিয়তার কোনো প্রমাণ তারা পাননি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী হাওরাঞ্চলের ছয় জেলায় মোট দুই লাখ ১৯ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আট লাখ ৫০ হাজার ৮৮টি পরিবার।
সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের দুই হাজার ৮৬০টি বাড়ি সম্পূর্ণ এবং ১৫ হাজার ৩৪৫টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয় জেলায় মোট ২১৩ দশমিক ৯৫ মেট্রিক টন মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে; সুনামগঞ্জে তিন হাজার ৯০২টি হাঁস ও চারটি মহিষ মারা গেছে।
হাওরের পরিস্থিতি দেখতে প্রধানমন্ত্রী ৩০ এপ্রিল ২০১৭ সকালে  শাল্লা উপজেলা সদরে পৌঁছানোর পর স্থানীয় শাহেদ আলী বিদ্যালয়ের মাঠে সমাবেশে বক্তব্য দেন। দুর্গতদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রীও বিতরণ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা সেদিন জানান, হাওরের বন্যাকবলিত এলাকায় বিতরণের জন্য তিন হাজার ৫২৪ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রতি পরিবারকে মাসে ৫০০ টাকা করে দেয়া হয়েছে।
যেসব বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হাওর অঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের আপাতত কিস্তি আদায় স্থগিত করে সুদ মওকুফের আহ্বান ও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী হাওর এলাকার মানুষকে শুধু ফসলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে মাছ, গবাদীপশু ও হাঁস-মুরগি পালন বাড়ানোরও পরামর্শ দেন। হাওরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের নাব্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, খালগুলো যেন বেশি পানি নিষ্কাশন করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। হাওরকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
“প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে,প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।হাওরের সম্ভাবনাকেও আমাদের কাজে লাগাতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ভূমিকা পালনের কারণে আজ কৃষকেরা বাম্পার ফলন পেলো। এ সময় কৃষকদের মাঝে উপস্থিত হন হাওরপাড়ের কৃষক অ্যাডভোকেট আব্দুল হান্নান রতন, কৃষক মোঃ সিরাজ উদ্দিন তালুকদার, কৃষি অফিসার মোঃ মফিজুল ইসলাম নাফিজ, কৃষক অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান, কৃষক অহিদ আহম্দে, বর্গাাচাষী শহিদুল ইসলাম, আঃ সালাম, রুক্কন মিয়া, মোঃ আবু তাহের, বাচ্চু মিয়া, মোঃ ফুল মিয়া প্রমুখ।

ঐতিহাসিক ডিঙ্গাপোতা হাওরের একুশের দিঘি এলাকায় উচু ফাঁকা জায়গায় ক্ষেত থেকে ধান কেটে এনে মাড়াই করা হচ্ছে। মাঘান সিয়াধার ইউনিয়নের মাঘান, কুড়েরপাড়, শেওড়াতলী, পুটিউগা, বেথাম, গৌরাকান্দা, পেরিরচর, ঘোড়া উৎরা , গ্রামের শত শত কৃষক দিনরাত ধানকাটা ও মাড়াই করে সাথে সাথে ঐ স্থান থেকেই ভিজা ধান সহজে বিক্রি করতে পারছেন।

গত বছর এই দিনে হাওরে বন্যার পানিতে কৃষকের আধা পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে  এবার বোরো মৌসুমে সরকার বন্যা প্রতিরোধে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য কোটি টাকা বরাদ্ধ করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসন মাটির বাঁধ নির্মানের কাজ বাস্তবায়ন করে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 × three =