হাজার তারা…সূর্য… এখানে, আমরা যে পথ চলি’

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন নোবেল পুরস্কার পান তখন কাজী নজরুল ইসলামের বয়স প্রায় ১৪ বছর। প্রথম জীবন থেকেই রবীন্দ্র-নিন্দা তার পক্ষে ছিল সহ্যের অতীত । নজরুলের রবীন্দ্র-ভজনাকে বিদ্রুপ করে খেলার মাঠে হাতে হাতে ফল পেয়েছিলেন তার বন্ধুরা। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে গোলপোস্ট উপড়ে তাদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন কিশোর কবি। বন্ধু জগৎ রায়ের মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটলে বিষয়টি পুলিশ-আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিচারে আদেশ হয় তাকে জুভেনাইল কোর্টে পাঠানোর। শেষ পর্যন্ত অল্প বয়স বলে বিচারক নজরুলকে ক্ষমা করেন এবং কিছু সময় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখে কারাবাসের আদেশ প্রত্যাহার করেন। রবীন্দ্র-অনুরাগের এ রকম পরিণতি বাংলা সাহিত্যের আর কোনো কবির জীবনে ঘটেনি বোধ হয় ।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সরাসরি দেখা হয়েছিল ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে। তখন নজরুলের বয়স ২২ বছর। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে শান্তি নিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। বোলপুর স্টেশনে কাজী নজরুল ইসলাম এবং ড. শহী দুল্লাহকে অভ্যর্থনা জানান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একান্ত সচিব কবি সুধাকান্ত রায় চৌধুরী।

নজরুল রবীন্দ্রনাথের কাছে কবিতার আবৃত্তি শুনতে চেয়ে ছিলেন। কবিগুরু বললেন, ‘সে কি? আমি যে তোমার গান ও আবৃত্তি শোনবার জন্যে প্রতীক্ষা করে আছি, তাড়াতাড়ি শুরু করে দাও।’ নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন। এছাড়াও তিনি কয়েকটি রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে শোনান। নজরুলের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথও আবৃত্তি করেন।’ নজরুল যখন জোড়াসাঁকো যাচ্ছিলেন সে সময় তিনি গীতাঞ্জলির প্রায় সবগুলো গানই গেয়ে ছিলেন। জানা যায়, কমরেড মোজাফফর আহমেদের কাছ থেকে শুনে রবীন্দ্রনাথ ভীষণ ভাবে বিস্মিত হন, নজরুলকে কাছে ডেকে পাশে বসান !

১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবিতা রচনা করে নজরুল সরাসরি চলে যান জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। উচ্চকণ্ঠে ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ গাইতে গাইতে নজরুল ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করে ডাকলেন গুরুদেব আমি এসেছি। উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে থাকেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি।
তিনি রবীন্দ্রনাথকে বলেন, গুরুদেব আমি আপনাকে খুন করবো। রবীন্দ্রনাথ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা শুনে কবিতার প্রশংসা করেন এবং নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বলেন ‘সত্যিই তুই আমাকে খুন করেছিস’।

১৯২২-এর ২৫ জুন কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঐ স্মরণসভায় নজরুলকে পাশে বসিয়েছিলেন। নজরুল আবৃত্তি করেছিলেন ‘সত্যকবি’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে নজরুলকে স্নেহ বন্ধনে আবদ্ধ করায় তখনও কবি-সাহিত্যিকরা ঈর্ষান্বিত হয়ে ছিলেন।

ধূমকেতুর ১২শ সংখ্যায় (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২) প্রকাশিত নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামক একটি প্রতীকধর্মী কবিতা প্রকাশের পর নজরুলকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ মামলা করা হয়। ১৯২৩-এর ১৬ জানুয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহো মামলার রায় দেন। এতে নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়।

নজরুল যখন জেলে সে সময় রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ প্রকাশ পায়। বইটি তিনি নজরুলকে উৎসর্গ করেন-‘শ্রীমান কবি নজরুল ইসলাম স্নেহভাজনেষু-এই বলে।বই টিতে তিনি স্বাক্ষর করে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। সে সময় নজরুল কে বলতে বলেছিলেন- তাকে বল কবিতা লেখা যেন কোনো কারণেই বন্ধ না করে। সৈনিক অনেক মিলবে, কিন্তু যুদ্ধে প্রেরণা দেওয়ার কবিও তো চাই”।

তখনকার সমাজ কি সেটা ভালভাবে গ্রহণ করতে পারেনি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাদের বোঝাবার চেষ্টা করেছেন যে নজরুল সাধারণ কেউ নন।
তিনি বলেছিলেন- ‘জাতীর জীবনের বসন্ত এনেছে নজরুল; তাই আমার সদ্য প্রকাশিত ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যখানি ওকেই উৎসর্গ করেছি।’ এখানে নজরুল সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের একটি মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল- রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- ‘আমি জানি তোমাদের মধ্যে কেউ এটা অনু মোদন করতে পারনি। আমার বিশ্বাস, তোমরা নজরুলের কবিতা না পড়েই এমন মনোভাব পোষণ করেছ। আর পড়ে থাকলেও তার মধ্যে রূপ ও রসের সন্ধান করনি, অবজ্ঞাভরে চোখ বুলিয়েছ মাত্র।কাব্যে অসির ঝনঝনা থাকতে পারে না, এও তোমাদের আবদার বটে। সমগ্র জাতির অন্তর যখন সে সুরে বাঁধা, অসির ঝনঝনায় যখন সেখানে ঝংকার তোলে, ঐকতান সৃষ্টি হয়, তখন কাব্যে তাকে প্রকাশ করবে বৈকি। আমি যদি আজ তরুণ হতাম, তাহলে আমার কলমেও এই সুর বাজত”।

নজরুল বইটি পেয়েই বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এ প্রসঙ্গে নজরুল লিখেছেন, ‘এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক আমায় উৎসর্গ করেন। তাঁর এই আশীর্বাদ-মালা পেয়ে আমি জেলের সর্বজ্বালা, যন্ত্রণা ক্লেশ ভুলে যাই।’
১৯২৩-এর ১৪ এপ্রিল হুগলি জেলে নজরুল অনশন করেন। এই অনশন ভঙ্গ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ প্রেসিডেন্সি জেলের ঠিকানায় নজরুল ইসলামের কাছে টেলিগ্রাম পাঠান। তাতে লেখেন, Give up hunger strike, our literature claims you. জেল কর্তৃপক্ষ টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠায়। কারণ, নজরুল তখন ছিলেন হুগলি জেলে।

পরবর্তিতে রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে থাকার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। কিন্তু অস্থির প্রকৃতির বিদ্রোহী নজরুল কোথায়ও এভাবে নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকতে চাননি।নজরুল লিখেছেন” ‘অনেক দিন তাঁর কাছে না গেলে নিজে ডেকে পাঠিয়েছেন। কতদিন তাঁর তপোবনে (শান্তিনিকেতন) গিয়ে থাকবার কথা বলে ছেন। হতভাগা আমি তাঁর পায়ের তলায় বসে মন্ত্র গ্রহণের অবসর করে উঠতে পারলাম না। বনের মোষ তাড়িয়েই দিন গেল।’

১৯২৮ সালে নজরুল তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘সঞ্চিতা’ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। নজরুল সম্পাদিত ‘ধুমকেতু’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-
”আয় চলে আয়, রে ধুমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দেরে চমক মেরে’
আছে যারা অর্ধচেতন” !

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুল ইসলামের আন্তরিক সম্পর্ক অটুট থাকুক এটা মৌলবাদী মুসলমানরা যেমন চাননি, তেমনি চাননি মৌলবাদী হিন্দুরাও। দুজনের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য দুপক্ষ থেকেই নানা ধরনের সমালোচনা, আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র অবিরামভাবে চলে আসছিল। সাহিত্যের মর্মমূলে প্রবেশ করার যোগ্যতা বা অধিকার যারা রাখেন না, তারা রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বিচার করেছেন ধর্ম দিয়ে। তারা বুঝতে পারেননি মানবিকতার সাধনাই করে গেছেন চিরকাল রবীন্দ্র-নজরুল।

বিদ্রোহী কবির নিজের ভাষায় ”একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেনঃ দেখ, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে ?
হিন্দু-মুসলমানদের কথা মনে উঠলে আমার বারেবারে গুরুদেবের ঐ কথাটাই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, যে এ-ন্যাজ গজালো কি করে? এর আদি উদ্ভব কোথায়? ঐ সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় তা ভিতরেই হোক আর বাইরেই হোক তারাই হয়ে ওঠে পশু। যে সব ন্যাজওয়ালা পশুর হিংস্র্রতা সরল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে শৃঙ্গরূপে, তাদের তত ভয়ের কারণ নেই, যত ভয় হয় সেই সব পশুদের দেখে যাদের হিংস্রতা ভিতরে, যাদের শিং মাথা ফু’টে বেরোয় নি”!

রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’। বলেছেন মানবিক ধর্মের কথা যা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের উর্ধ্বে। একইভাবে নজরুল বলেছেন, ‘আমি আজও মানুষের প্রতি আস্থা হারাইনি। মানুষকে আমি শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি। শ্রষ্টাকে আমি দেখিনি কিন্তু মানুষকে আমি দেখেছি। এই ধূলিমাখা, অসহায়, দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।’ নজরুল বলে গেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’

কমরেড মোজাফফর আহমদের স্মৃতি কথায়! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স ষাট ও নজরুল ইসলামের বাইশ। কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরিতে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভা। নজরুল সভাকক্ষে ঢুকেই সোজা মঞ্চে উঠে কবির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে মাথায় আশীর্বাদ নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছিলেন।
মঞ্চ থেকে নামার মুখেই রবীন্দ্রনাথ খপ করে নজরুলের হাত ধরে টান লেন। না নজরুল, তুমি নিচে নয়, তুমি এই সভায় আমার পাশেই বসবে”।এই স্নেহ আর শ্রদ্ধার চাপেও অন্যান্য কবি সাহিত্যিকরা অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন ।

কাজী নজরুল ইসলাম গুরু বলে মান্য করতেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে। নজরুল নিজের কাব্য চর্চা থেকে অন্যত্র মনোনিবেশ করায় রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুলকে বলে ছিলেন, ‘তুমি নাকি এখন তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাছো?’ নজরুল লিখেছিলেন কবিতা , ‘গুরু কন আমি নাকি তলো য়ার দিয়ে দাড়ি চাছি…।’
রবীন্দ্রনাথের আশি বছর পূর্তি হয় ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। তখন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে লিখেন, ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’। ১৯২০ থেকে ১৯৪১ রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পূর্বকাল পর্যন্ত রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক স্নেহ ও শ্রদ্ধার।

কাকতালীয় হলেও – অবাক হতে হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলাম দু’জনের বয়সের ব্যবধান ৩৮ বছরের হলেও সম্পর্কে নৈকট্য ছিল। দু’ জনের ভেতরে ছিল বিস্তর মিল। দু’জন জন্ম নেন মে মাসে; আবার দু’ জনেরই মহাপ্রয়াণ আগস্ট মাসে। একজন সঞ্চয়িতার কবি আর একজন সঞ্চিতার কবি।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক বছর পরেই নজরুল চিরতরে অসুস্থ এবং ক্রমান্বয়ে সম্বিতহারা ও নির্বাক হয়ে যান। বাংলার দুই মহান কবির লেখনি প্রায় একই সময়ে নীরব হয়ে যায়।
————————
তথ্যসূত্র : ‘নজরুল : সৃজনের অন্দরমহল’ আব্দুর রউফ চৌধুরী
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম: দু’জনের অন্তমিল – সুভাষ সিংহ রায়
রবীন্দ্র স্মরণ, রবীন্দ্র নজরুল সম্পর্ক, সাংবাদিক, রবীন্দ্রগবেষক হাবিবুর রহমান স্বপন

(সৌজন্য : সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বাংলাদেশ )

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × four =