হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ণ করার ভয়াবহ ষড়যন্ত্র-মন্দির গীর্জা আক্রমন-১৭ নাগরিক হত্যার জঙ্গি পরিকল্পনা ফাঁস

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সুমি খান : হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ণ করার ভয়াবহ ছক করেছে জেএমবি । একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াতের ব্যর্থতা সফল করতে এবার নতুন নামে মাঠে নেমেছে জামায়াতেরই দীক্ষিত জঙ্গি গোষ্ঠি আনসারুল্লাহ বাংলা টীম (এবিটি)।  অন্তত ১৭ জন হিন্দু মুসলিম এবং খৃষ্টান  নিরীহ নাগরিক হত্যার পরিকল্পনা করে  জেএমবি তালিকা করেছে ২০১৬ সালে। যা পুলিশি অভিযানে ব্যর্থ হয়ে গেছে। ২০১৭ সালে সেসব  হত্যাযজ্ঞের নতুন  ষড়যন্ত্রে  আত্মঘাতী জঙ্গিদল গোছাচ্ছিল জেএমবি। ভয়াবহ এ পরিকল্পনা এবং হত্যাকান্ডের ছকের তালিকা  ফাঁস হয়ে গেলো পুলিশী তদন্তে।

জঙ্গিদের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের হত্যা এবং  তাদের  হামলার ‘টার্গেট সেট’ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম ইসলাম বলেন, মতাদর্শগত ভিন্নতা নিয়েই  বর্তমানে জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে দুটো ভাগ রয়েছে।  দু’টোই মূলত জামায়াত কর্মীদের নিয়ে সংগঠিত।এরমধ্যে এক ভাগ নব্য জেএমবি, আর অন্য ভাগ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)। এদের মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলাটিম  অপপ্রচার করে ,” ভারতে আমাদের একজন মুসলিম ভাইয়ের ওপর হামলা হয়েছে তাই আমরা পুরো হিন্দু ‘বডি’র ওপর প্রতিশোধ নিবো।”  বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে ‘হিন্দু বডি’ বলে ইঙ্গিত করে এবিটি জঙ্গিগোষ্ঠী ।

পুলিশের স্পেশাল টাস্ক গ্রুপ (এসটিজি) সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর বগুড়া শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে হামলা এবং গত বছরের ২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্র শিবির । সেই দু’টি ঘটনা এবং গাজীপুরের পাতারটেকে সোয়াত টিমের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ১৯ জঙ্গির কাছ থেকে পরবর্তী হামলা সম্পর্কিত কয়েকটি তালিকা পাওয়া যায়।সেই তালিকা থেকে জঙ্গিদের পরবর্তী  টার্গেট সম্পর্কে জানতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সূত্রে প্রকাশ, তালিকার প্রথম নাম শেরপুর কল্যাণী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক বিপ্লব মাস্টার ।  হত্যাকান্ড  ঘটানোর সম্ভাব্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছিলো ২০ জুন,২০১৬। তালিকায় দ্বিতীয় নাম ছিলো সরকারি লিক্যুইড ব্যবসায়ী নবকুমার। উল্লাপাড়া মোহনপুর বাজারের সরকারি ভাটিখানায় তার মদের দোকান। হত্যাকান্ড ঘটানোর সম্ভাব্য দিন নির্ধারণ করা হয় ২৩ জুন, ২০১৬। এরপরেই নাম ছিলো কম্পিউটার যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্রের। সিরাজগঞ্জ সদরে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তালিকার চতুর্থ নাম নাটোরের রাজবাড়ীর শিবমন্দিরের পুরোহিত গোবিন্দ সাধু। এরপরের জন ঠাকুরগাঁও হরিপুর বাজারের এক হিন্দু চিকিৎসক। টার্গেট তালিকার ৫ নম্বরে ছিলো ঠাকুরগাঁও হরিপুর বাজারের অপূর্ব গার্মেন্টস নামের এক গার্মেন্টস মালিকের নাম। ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুরের যাদুরানী বাজার এলাকার হিন্দু হোমিও চিকিৎসক কিষান চন্দ্র ভৌমিকের নাম তালিকার ৬ নম্বরে ছিল।  তালিকার অষ্টম নাম ছিলো দিনাজপুর বিইউ উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক খগেন্দনাথ। এরপরের নাম ছিলো গাইবান্ধার বাদিয়াখালি বাজারের পশ্চিম দিকের এক ওষুধের দোকানের  হিন্দু ব্যক্তির। তালিকার দশম নাম রাজশাহী বাগমারার চিকিৎসক নীরেন্দ্র নাথ সরকার। এরপরেই জয়পুরহাট ডিগ্রী কলেজের প্রিন্সিপাল ওয়াজেদ পারভেজ। তালিকার দ্বাদশ নম্বরে আশুলিয়া পঞ্চপুটি বৌদ্ধমিন্দরের ৪ থেকে ৫ জন। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে তাদের উপর হামলার সম্ভাব্য দিন নির্ধারণ করা ছিলো। এর কয়েকদিন পরেই টাঙ্গাইলের খ্রিস্টানপল্লী হিসেবে পরিচিত জলছাত্র এলাকায় হামলার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের।

সীতাকুন্ডে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান পরিচালনার একদিন পর ঢাকায় ব্যাবের উপর জঙ্গিদের আত্মঘাতী হামলার পর বেরিয়ে এলো ইতিপূর্বে জঙ্গিদের নেয়া নানা হত্যা পরিকল্পনার কথা। আইনশৃংখলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, গত বছর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পরে আরো বাণিজ্যিক ও স্বেচ্ছাসেবক প্রতিষ্ঠানে হামলার হামলার পাশাপাশি অন্তত ১৭ জন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল জঙ্গিরা। ১৭ জনের মধ্যে তিন ব্যবসায়ীও ছিলেন। কিন্তু আইশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ১৯ জঙ্গি গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

এ কারণেই তারা তৃনমূল পর্যায়ের হিন্দুদের ওপর হামলার টার্গেট করে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আইশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত চেষ্টার ফলে জঙ্গিরা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এসব জঙ্গিদের যারা অর্থায়ন করতো, তারাও এখন আর সেভাবে করতে পারছে না। এসব মিলিয়ে জঙ্গিদের কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্তিমিত। তবে তাই বলে কোনোভাবে তাদের দুর্বল ভেবে অবহেলা করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে বলেও জানান মনিরুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১ জুলাই রাতে একদল জঙ্গি গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে ঢুকে ১৭ বিদেশি এবং ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা সহ ২০ জনকে হত্যা করে। পরদিন সকালে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে  হোলি আর্টিজানের নিয়ন্ত্রণ নেয় নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর ঈদের জামাতের সময় শোলাকিয়ায় হামলা চালায় জঙ্গিরা। পরবর্তীতে রাজধানীর কল্যাণপুর, মিরপুর, উত্তরার আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এমনকি সর্বশেষ সীতাকুন্ডে ২টি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানোর একদিনের মাথায় উত্তরায় হজ ক্যাম্পের পাশে র‌্যাব সদস্যদের ওপর আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছে, তার পরদিন সকালেই খিলগাঁও র‍্যাব চেকপোষ্টে  হামলা করে আত্মঘাতী জঙ্গিরা।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

thirteen − 7 =