২১ আগস্ট মামলার আলামত পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে সংঘটিত গ্রেনেড হামলা পরবর্তী উদ্ধারকৃত আলামত উদ্দেশ্যেমূলক ও পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সিনিয়র এডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আজ ১৬তম দিনের মতো যুক্তিতর্কে এ কথ্য উপস্থাপন করেন।

আজ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষি (পিডব্লিও ৬৩) ঘটনাকালীন ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার এস এম মিজানুর রহমান, (পিডব্লিউ-৬৪) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম এমদাদুল হক, (পিডব্লিউ-৬৫) ডিজিএফআই-এর তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) সাদিক হাসান রুমির দেয়া সাক্ষ্য আজ যুক্তিতর্কে উপস্থাপন করেন। সাদিক হাসান রুমির দেয়া সাক্ষ্যের আলোকে যুক্তি উপস্থাপন অসমাপ্ত অবস্থায় মামলায় আজকের কার্যক্রম মুলতবী করা হয়।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে এ মামলার বিচার চলছে। মামলার কার্যক্রম আগামীকাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
সাক্ষী এস এম মিজানুর রহমানের জবানবন্দীর আলোকে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্কে উল্লেখ করে যে, ২১ আগস্ট ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এই সাক্ষীকে সমাবেশের ৩ ঘন্টা আগে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ সাক্ষীকে ২১ আগস্ট ঘটনার সঠিক তদন্তে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিরত থাকতে বলেছেন।

ঘটনার পর বঙ্গবন্ধু এভিনিউর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধারকৃত আর্জেস গ্রেনেড মামলার আলামত হিসেবে সংরক্ষণ না করে তৎকালীন সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের পরস্পর যোগসাজসে তা ধ্বংস করা হয়। যারা এ মামলায় বর্তমানে আসামী রয়েছেন। যুক্তিতর্কে রাষ্ট্র পক্ষ জানায়, সাক্ষী এস এম মিজানুর রহমানের দেয়া জবানবন্দী অনুযায়ী অপরাধীদের অপরাধ সংঘটন নির্বিঘœ করতে পরিকল্পনা অনুযায়ী ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলা ঘটানো হয়।
সাক্ষী এ কে এম এমদাদুল হকের জবানবন্দীর বিষয় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্কে জানায়, ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে এ সাক্ষী ২ জন আসামী মাজেদ ভাট ও গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্ধী রেকর্ড করেন এবং মামলার ৩ সাক্ষী- লে. কর্নেল মো. আফজাল নাসিম ভুইয়া, লে. কমান্ডার মিজানুর রহমান ও সাক্ষী নাহিদ লায়লা কাকনের (আসামী মাজেদ ভাটের স্ত্রী) জবানবন্দী রেকর্ড করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী মেজর জেনারেল (অব.) সাদিক হাসান রুমি এ মামলার ২৫ আসামীকে সম্পৃক্ত করে আদালতে সাক্ষ্য দেন। এরা হলেন- এএসপি (অব.) আবদুর রশিদ, তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম আরিফ, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, মেজর জেনারেল এটিএম আমিন (পলাতক), মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, হানিফ পরিবহনের হানিফ (পলাতক), বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী (পলাতক), ডিআইজি খান সাঈদ হাসান (পলাতক), সাবেক আইজিপি খোদাবক্স চৌধুরী, লে. কর্নের (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার (পলাতক), লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, লুৎফুজ্জামান বাবর, শেখ আবদুস সালাম, শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মাওলানা তাজউদ্দিন (পলাতক), মুফতি হান্নান, আবু জানদাল, এএসপি (অব.) মুন্সী আতিকুর রহমান, এসপি ওবায়দুর রহমান খান, বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, শরীফ সাইদুল আলম বিপুল, আইজিপি শহীদুল হক এবং তারেক রহমান।

প্রধান কোঁসুলিকে যুক্তিতর্ক পেশে আরো সহায়তা করছেন আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ, আকরাম উদ্দিন শ্যামল, ফারহানা রেজা। এছাড়াও রাষ্ট্রপক্ষে মো. আমিনুর রহমান, আবুল হাসনাত ও আশরাফ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে আইনজীবী আব্দুল সোবহান তরফদারসহ অন্যান্যরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গত ২৩ অক্টোবর থেকে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক শুরু হয়েছে।
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৫১১ জনকে সাক্ষি করা হয়েছে। এর মধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) সিআইডির জ্যেষ্ঠ বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দসহ ২২৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামীপক্ষেও ২০ জন সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ এসব সাক্ষ্য জেরা করেছে।

২১ আগষ্টের ওই নৃশংস হামলায় পৃথক দুটি মামলায় মোট আসামী ৫২ জন। মামলার আসামী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে রয়েছে। এ মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী, লে.কমান্ডার (অব:) সাইফুল ইসলাম ডিউক এবং মামলার সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তা- সিআইডি’র সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডি’র সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদসহ মোট ৮ জন জামিনে রয়েছে। তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মেজর জেনারেল (এলপিআর) এটিএম আমিন, লে.কর্নেল (অব:) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারসহ ১৮ জন এখনো পলাতক।

এছাড়া ৩ জন আসামী জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুফতি হান্নান ও শরীফ সাইদুল আলম বিপুলের অন্য মামলায় মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়ায় এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পলাতক আসামীদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী রয়েছেন।
বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। ওই নৃশংস হামলায় ২৪ জন নিহত ও নেতকর্মী-আইনজীবী-সাংবাদিকসহ পাঁচ শতাধিক লোক আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পত্নী আইভি রহমান। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অন্যান্য নেতা এই গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যান। এতে অল্পের জন্য শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের প্রচন্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

one + fifteen =