২৫ মার্চ ১৯৭১: যা ঘটেছিলো সেই কালরাতে

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

Genocide Pic

 

আজ সেই ভয়াল বীভৎস ২৫শে মার্চ।একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানী দানবরা নির্বিচারে মেতে উঠেছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালী নিধনযজ্ঞে। ঢাকাসহ দেশের অনেক স্থানে সেই এক রাতেই হানাদাররা নির্মমভাবে হত্যা করেছিল প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক ঘুমন্ত বাঙালীকে। আজ ১৯৭১ সালের সেই রাত!বিশ্বের ভয়ালতম গণহত্যার রাত!যেদিন স্তম্ভিত বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে বর্বর পাকসেনাদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ’!মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন লিখেছেন সেই কালো রাতের হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস!

সেই রাতে মানুষরূপী ক্ষুধার্ত শকুনিরা শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি,পাকজান্তারা সেই রাতে পিতার সামনে কন্যাকে আর পুত্রের সামনে মা’কে গণধর্ষণের পর কচুকাটা করে হত্যা করেছে।কাউকে কাউকে তারা সেদিন বাঁচিয়ে রেখেছিল নিহতদের কবর খোঁড়ার কাজ করাতে।মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তাদের বাধ্য করেছে প্রিয়জনের কবর খুঁড়তে।কাউকে দিয়ে সহপাঠীদের লাশ বয়ে এনে মাটি চাপা দিয়েছিল পাকসেনারা।তারপরও শেষ  রক্ষা হয়নি। কাজ শেষে তাদের লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়েছে। সেদিন রাতে শকুনির দল জগন্নাথ হল ছাড়াও একযোগে ইকবাল হল, রোকেয়া হল একে একে সবকিছু দানবের হিংস্র থাবায় তছনছ করে দিয়েছিলো।পাকজান্তাদের কালো থাবা থেকে রক্ষা পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও।

‘অবিনাশী আগুনে পোড়ে হায়রে শোকার্ত স্বদেশ/ দুখিনী মায়ের অশ্রু জমা হয় নিভৃত পাঁজরে/যে যাবে যুদ্ধে এখনই সে উঠুক উঠুক ঝলসে/ যে যাবে যুদ্ধে সবকিছু ভাঙুক সে …।‘

উত্তাল দিনশেষে নেমেছে সন্ধ্যা।গভীর হতে শুরু করেছে রাত।তখনও কেউ জানে না কী ভয়ঙ্কর, নৃশংস ও বিভীষিকাময় রাত আসছে বাঙালীর জীবনে।ব্যস্ত শহর ঢাকা প্রস্তুতি নিচ্ছে ঘুমের। ঘরে ঘরে অনেকে তখন ঘুমিয়েও পড়েছে। হঠাৎ যেন খুলে গেল নরকের সব ক’টি দরোজা।

রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হলো হনন-উদ্যত নরঘাতক কাপুরুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনী।ছড়িয়ে পড়ল শহরময়।আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে গর্জে উঠল অত্যাধুনিক রাইফেল,মেশিনগান ও মর্টার।

২৫ মার্চ ১৯৭১ মধ্যরাতের অন্ধকারে পাক জল্লাদ বাহিনী এক দানবীয় নিষ্ঠুরতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালীর ওপর।চললো বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ আর ধ্বংসের উন্মত্ততা। হতচকিত বাঙালী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঢলে পড়লো মৃতু্র কোলে।শহরের রাজপথ, অলিগলি, ফুটপাথ, খেলার মাঠ, ক্যাম্পাস সর্বত্র মৃত্যু রেখে গেছে তার করাল স্বাক্ষর।মানুষের কান্নায় ভারি হয়ে এলো শহরের আকাশ।সে কান্না ছাপিয়ে তখন আকাশে  মুর্হুমুহু আগুনের লেলিহান শিখা।মধ্যরাতে ঢাকা হয়ে উঠল লাশের শহর।

একাত্তরের এই দিনে চিরকাঙ্খিত ও প্রিয় স্বাধীনতার জন্য উন্মাতাল লাখো বাঙালীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে বাংলার সোঁদা মাটি। ঘুমন্ত শিশু,বঁধূ, আবাল বৃদ্ধ বনিতার রক্তে কলঙ্কিত হয়েছিল মানব সভ্যতার ইতিহাস।সেই নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা চেঙ্গিস খান-হালাকু খানদের নৃশংস নির্মমতাকেও হার মানায়।এই রাত একদিকে যেমন ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মমুহূর্তটি প্রত্যক্ষ করেছিল,অন্যদিকে এ রাতেই রচিত হয়েছে বিশ্বের জঘন্যতম গণহত্যার মুহূর্ত।

চারিদিকে রক্ত আর রক্ত; শহীদদের সারি সারি লাশ।সেদিন পাক বাহিনীর হিংস্র শ্বাপদদের হাত থেকে রক্ষা পেতে রোকেয়া হলের ছাদ থেকে প্রায় ৫০ জন ছাত্রী লাফ দিয়ে পড়েছিল।নরপশুরা সেদিন হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণ,লুট,জ্বালাও-পোড়াও প্রত্যক্ষ করেছিলো শহরের সব জায়গায়।

একাত্তরের ন’মাসে স্বাধীনতার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল বাংলার ৩০ লাখ মানুষকে।তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তাদের এদেশীয় দোসর ঘাতক-দালাল-রাজাকার-আলবদর-আল শামস বাহিনীর সদস্যরা।স্বাধীনতার জন্য সম্ভ্রম হারাতে হয়েছিল অসংখ্য মা-বোনকে। মাত্র ন’মাসে এতো বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা ও নারী নিগ্রহের নজির বিশ্ব ইতিহাসে আর নেই।

কী ঘটেছিল সেই ভয়াল সর্বনাশা রাতে?

সূর্য ডুবলো।পাঁচটা বেজে চুয়াল্লিশ মিনিট।এর ঠিক এক মিনিট পরেই ঢাকার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে জেনারেল ইয়াহিয়া সোজা এয়ারপোর্টে চলে গেলেন।এর আগেই বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া সিরিজ বৈঠক ব্যর্থ হয়ে যায়।পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বিমানে করে করাচী পাড়ি দিলেন।বাঙালী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পালিয়ে গেলেন।

কৃষ্ণপক্ষের রাত।সারাদিন রোদেপোড়া নগরী চৈত্রের হাওয়ায় জুড়িয়ে আসছিল।এরপর দু’ঘণ্টাও পেরোয়নি।ক্যান্টনমেন্ট থেকে জিপ, ট্রাক সৈন্যবোঝাই দিয়ে ট্যাঙ্কসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়লো।তারা ছক অনুযায়ী পজিশন নিলো। গোলন্দাজ,সাঁজোয়া পদাতিক তিন বাহিনী থেকে বাছাই করা তিন ব্যাটালিয়ন ঘাতকদল।

রাত ১০টা ৩৫। নর্থ ঢাকায় সৈন্যরা ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল’ ঘিরে ফেলেছে।হোটেলে অবস্থানরত বিদেশী সাংবাদিকেরা বুঝলেন তারা কার্যত বন্দী।রিসেপশনে কালো বোর্ডে চকখড়ি দিয়ে এক বাচ্চা ক্যাপ্টেন লিখে দিল বাইরে বেরুলেই গুলি। বিদেশী সাংবাদিকরা বাইরে বেরুতে না পেরে রেডিও অন করলেন।না,কারফিউর কোন ঘোষণা নেই।বাইরে ট্যাঙ্কের শব্দ।ছুটে সবাই ১২ তলায় উঠলেন। মেশিনগানের গুলিতে কানপাতা দায়। জুলফিকার আলী ভুট্টোর রুমের দরোজায় সবাই থমকে দাঁড়ালেন।কড়া পাহারা।তাকে কাঁচা ঘুমে জাগানো বারণ । ঢাকা-করাচী টেলিপ্রিন্টার লাইনও কেটে দেয়া হয়েছে। বাইরের জগতের সাথে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো।বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বেতারের প্রচার।কেউ জানতেই পারেনি ততক্ষনে যেন নরকের দরোজা খুলে গেছে ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দায়িত্বশীল গণমাধ্যম ও সেদিন রেহাই পায়নি জল্লাদ ইয়াহিয়ার নীলনক্সার ঘৃণ্য পরিকল্পনা থেকে। শহরময় হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্ত হাতে কলম ধরার কারণে প্রথম আঘাত আসে তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (বর্তমান শেরাটন হোটেল)সামনে সাকুরার পেছনের গলিতে থাকা পিপলস ডেইলি ও গণবাংলা অফিসের উপর।গ্যাসোলিন ছিটিয়ে পিপলস ডেইলি ও গণবাংলা অফিস জ্বালিয়ে দেয়া হয় ।এরপর একে একে দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাক, জাতীয় প্রেসক্লাবেও অগ্নিসংযোগ,মর্টার সেল ছুড়ে সাহসী কন্ঠের গণমাধ্যম কার্যালয়গুলোকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে পাক হানাদাররা।এ হামলায় জীবন দিতে হয় সে সময়ে কর্মরত বেশ ক’জন গণমাধ্যম কর্মীকে।।

‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে হানাদার বাহিনীর অতর্কিত সেই বর্বরোচিত হামলায় সবাই হতবাক হয়ে যায়। মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন ট্যাঙ্ক, সঙ্গে সেনা বোঝাই লরি নিয়ে ঢুকলো।ইকবাল হল (বর্তমানে জহুরুল হক হল) ও জগন্নাথ হলে মধ্যযুগীয় কায়দায় চলে পাকিস্তানী হানাদারদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ। রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে মানুষরূপী নরপিশাচরা। অসহায় নারী-পুরষের মর্মান্তিক আর্তনাদ। চলল বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ আর ধ্বংসের উন্মত্ত তা। প্রতিটি রুমে রুমে ঢুকে পড়ে ঘুমন্ত ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করে পাক জল্লাদরা। একে একে গুলি করে,বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হলো জগন্নাথ হলের ১০৩জন ছাত্রকে। হলের কর্মচারীদের কোয়ার্টারে ঢুকে তাদের স্ত্রী-বাচ্চাসহ পুরো পরিবারকে একে একে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।

সেই রাতে জগন্নাথ হল ছাড়াও শকুনির দল একে একে ইকবাল হল, রোকেয়া হল দানবের হিংস্র থাবায় তছনছ করে দিয়েছিলো।পাকজান্তাদের কালো থাবা থেকে রক্ষা পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সনতোষ ভট্টাচার্য,ড.মনিরুজ্জামানসহ বিভিন্ন বিভাগের ৯জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।রাস্তার দু’পাশে ব্রাশফায়ার করে অসংখ্য নিরীহ,গরীব মানুষকে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। মেডিক্যাল কলেজ ও ছাত্রাবাসে  একের পর এক কামানের গোলা ছুড়ে হত্যা করা হয় অসংখ্য মানুষ।

রাজারবাগ পুলিশের সদর দফতরে পাকসেনাদের সাঁড়াশি অভিযানের মুখেও সেই রাতে  বাঙালী পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণের বদলে রাইফেল তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারী মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যায় সমস্ত ব্যারিকেড। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশের সদর দফতর।সেই রাতে ১১শ’ বাঙালী পুলিশের রক্ত ঝরিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি।গুঁড়িয়ে দিয়েছিল পুরো ব্যারাক, জ্বালিয়ে দিয়েছিল সবকিছু।

নগরজুড়ে রাতভর চলেছে বর্বরোচিত নিধনযজ্ঞ ও ধ্বংসের তান্ডব। হতচকিত বাঙালী কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে।দানবীয় বাহিনীর আক্রমণের বিভীষিকায় নিমজ্জিত হয় সেই রাতের ঢাকা। কেঁদে ওঠে শহরের রাজপথ, অলিগলি, ফুটপাথ, খেলার মাঠ, ক্যাম্পাস। মানুষের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে আকাশ। সে কান্না ছাপিয়ে তখন আকাশে কেবলই মুহুর্মুহু আগুনের লেলিহান শিখা। চারদিকে কেবল প্রজ্বলিত অগ্নি,ধ্বংস আর মর্মন্তুদ চিৎকার।

মধ্যরাতেই ঢাকা তখন লাশের শহর।দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও একইভাবে অতর্কিতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো পাকসেনা এবং তাদের সহযোগীরা।সেই পরিস্থিতিতেও বাঙালী ছাত্র-জনতা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো।ঢাকার ফার্মগেট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা চারপাশে সর্বত্র এই প্রতিরোধ ছিল।প্রতিরোধ ছিল চট্টগ্রামেও।### ২৫.০৩.২০১৫

 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − 1 =