৩০ বছরেও চট্টগ্রাম গণহত্যার বিচার পাননি নিহতদের স্বজনরা

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের দমন পীড়নের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশ পন্ড এবং শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে অনর্গল গুলি বর্ষণ করে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের  পুলিশ বাহিনী।১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে স্বৈরাচারবিরোধী সমাবেশে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি ছিলেন । প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে  পুলিশের পরিকল্পিত তাণ্ডবে নিহত হন ২৪ জন নিরীহ মানুষ।এমন বর্বরোচিত গণহত্যার বিচার পাননি নিহতদের স্বজনরা। আদালতে ঝুলে আছে মামলার বিচার কাজ। এমন নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে আদালত প্রাঙ্গণের প্রধান ফটকে নির্মিত ছোট্ট স্মৃতিফলকে প্রতি বছর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন।

২৪ জানুয়ারী ১৯৮৮ স্মৃতিস্তম্ভ

ঘটনার দিন লালদীঘি ময়দানে যাওয়ার পথে কোর্ট বিল্ডিংয়ের সামনের পথ যখন নেত্রীকে বহনকারী গাড়ি অতিক্রম করে ঠিক তখনই শুরু হয় শেখ হাসিনার গাড়ি বহর ও জনতার উপর অতর্কিত হামলা। জানা যায়, শেখ হাসিনার উপর গুলি করার সময় এক পুলিশ রাইফেলের কানেকশন বেল্ট খুলে ফেলায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ সময় আইনজীবীরা শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে আইনজীবী সমিতি অফিসে নিয়ে রক্ষা করেন।আকস্মিক হামলায় জনতার দিগ্বিদিক ছুটোছুটিতে তৈরি হয় ভীতিকর পরিবেশ। বৃষ্টির মতো গুলিতে লুটিয়ে পড়ে ২৪ জন মানুষ। আহত হয় শত শত ছাত্র, শ্রমিক ও পেশাজীবী জনতা।

সেদিনের গণহত্যায় নিহত শহীদরা হলেন মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দীন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথেলবার্ট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি-কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আবদুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হেসেন, পংকজ বৈদ্য, বাহার উদ্দীন, হাশেম মিয়া, মো. কাশেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাস, শাহাদাত, বিকে দাস, চান্দ মিয়া ও সমর দত্ত। বর্বরোচিত হামলায় অংশ নেয়া এক পুলিশ সদস্যের রাইফেলের কানেকশন বেল্ট খুলে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। এসময় আদালত থেকে নেমে আইনজীবীরা শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে আদালত ভবনের আইনজীবী সমিতি কার‌্যালয়ে নিয়ে প্রাণে রক্ষা করেন।

বর্বরোচিত এ  হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ২৪ জানুয়ারিকে  ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ দিবস হিসেবে পালন করছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। গণহত্যায় নিহত শহীদদের স্মরণে নগরীর কোর্ট বিল্ডিংয়ের পাদদেশে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিফলক। স্থাপিত স্মৃতিফলকটির অবস্থা এখন শোচনীয়। অযত্ন অবহেলায় পড়ে রয়েছে স্মৃতিফলকটি। বছরের এই দিনটিতেই শুধু  শহীদদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানায়, সারা বছর কেউ খবর রাখে না শহীদ পরিবারের।প্রতিবছর গণহত্যা দিবসে স্মৃতিস্তটির উন্নয়ন এবং একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ করার দাবি জানানো হলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্মরণে আদালত ভবনের প্রধান গেটে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে প্রতি বছর এ দিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।

ঘটনার চার বছর পর ১৯৯২ সালে আইনজীবী শহীদুল হক বাদী হয়ে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ৪৬ জনকে আসামি করে কোতওয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার কাজী রকিবুল হুদাসহ কোতোয়ালী জোনের পুলিশ পরিদর্শক (পিবিআই) গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডলকে প্রধান আসামি করা হয়।

ঘটনার পর ২৯ বছর পেরিয়ে ত্রিশ বছরেও সেই ঘটনায় দায়ের করা মামলা  আলোর মুখ দেখেনি।ঝুলে আছে মামলার বিচারকাজ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির তৎকালীন পরিদর্শক কাদের খান আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। এরপর ২০০০ সালের মে মাসে গণহত্যা মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ১ শ’ ৬৮ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ২০১৬ সাল জুড়ে সাতজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। বাকি সাক্ষীরা হাজির না হওয়ার পেছনে পুলিশের গাফিলতি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের উদাসীনতাকে দায়ী করছে হতাহতের পরিবার। এরই মধ্যে মামলার বাদি শহীদুল হকও মারা গেছেন।
মামলার প্রধান আসামি তৎকালীন পুলিশ কমিশনার কাজী রকিবুল হুদা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমেরিকায় মারা যান।
এর মধ্যে সাতজন আইনজীবীসহ ১১ জন সাক্ষীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। তারা হলেন, পরেশ দাস, হাসান মুরাদ, ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন, স্বপন চৌধুরী, অর্পণ ঘোষ, শম্ভু নন্দী, কামাল উদ্দিন আহমেদ, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রশীদ, সৈয়দ মোক্তার আহাম্মদ ও তফসির উদ্দিন আহমেদ। মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ২৮ জানুয়ারি উক্ত মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।
গণহত্যা মামলায় ২০১৬ সালের ২৬ জুন আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন। বর্তমানে মামলাটি বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে রয়েছে। ওই আদালতের সরকারি কৌসুলী মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ।
মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে মেজবাহ উদ্দিন সুপ্রভাতকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাথে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে তাকে অবগত করি।
তিনি আরও বলেন, সময়মতো সাক্ষী হাজির না হওয়ায় এবং অনেক সাক্ষীকে খুঁজে না পাওয়ায় এ মামলা ঝুলে আছে।
২৪ জানুয়ারীর  নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহত অজয় সরকারের স্ত্রী শেফালী সরকার বলেন, অজিত সরকারের শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না। এখনো আমরা আশা করি এ গণহত্যার বিচার হবে । অজিত সরকার নিহত হওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সেদিনের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্মরণ করার জন্য পূর্ণাঙ্গ স্মৃতি কমপ্লেক্স দাবি  করছি আমরা।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − 8 =