থেমে থেমে গ্রেনেড বিষ্ফোরণ : সিলেটে জঙ্গিদের সাথে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে :৮০ জন উদ্ধার

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

সিলেট: সিলেটের জঙ্গি আস্তানা ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান এখনো চলছে। থেমে থেমে বিষ্ফোরণের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশের ধারণা, ‘মর্জিনা’ নামে কোড ব্যবহার করে ওই বাড়িটিতে অবস্থান নিয়েছে জেএমবি’র শীর্ষ জঙ্গিরা। এই জঙ্গি আস্তানায় নব্য জেএমবি প্রধান মুছার নেতৃত্বে বিষ্ফোরকের বিশাল ভান্ডার নিয়ে একটি শক্তিশালী জঙ্গি দল অবস্থান করছে বলেও ধারণা করছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।এর মধ্যে ২ জন অশীতিপর বৃদ্ধা সহ ৮০ জন কে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেছেন যৌথ বাহিনী ও ফায়ার ব্রিগেডের কর্মকর্তারা ।
সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকার সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা আতিয়া ভবনের ভেতরে রোববার বেলা পৌনে ১২টার দিকে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটায় দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ি এলাকার আতিয়া মহলে জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু হয়।২৫ মার্চ রাতে গ্রেনেড হামলায় ৬ জন নিহত হবার পর থেকে ১৪৪ ধারা জারি হয় এবং সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আতিয়া মহলের প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হুমায়ূন রশীদ চত্বরে ব্যারিকেড দিয়েছে পুলিশ। গণমাধ্যমকর্মীসহ কাউকেই সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।অভিযান চলমান রয়েছে।
রোববার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে আতিয়া মহল থেকে চারটি গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরআগে সকাল থেকেই সেখানে থেমে থেমে গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। এ সময় সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোরাও পাল্টা গুলি করে।
এখনো কোন মামলা হয় নি কোন গ্রেফতার নেই বললেন সিলেট মেট্রোপলিটনের পুলিশের (এসএমপি ) কমিশনার গোলাম কিবরিয়া । এক ব্রিফিংয়ে তিনি আরো বলেন, দু’জন অশীতিপর বৃদ্ধাকে উদ্ধার করা হয়েছে আতিয়া ভবন থেকে ।
সিলেট মহানগরের দক্ষিণ সুরমায় জঙ্গি আস্তানায় সেনা অভিযানের মধ্যে বোমা হামলায় আহত ৪৩ জন বর্তমানে এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক আজ দুপুরে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আহত অবস্থায় ৫০ জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। ছয়জন মৃত। আর একজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে রাখা হয়েছে।শনিবার রাতে পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে ১০টি অস্ত্রোপচার কক্ষে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখেন।

জঙ্গিবিরোধী এই অভিযানের মধ্যে শনিবার সন্ধ্যা৭ টার পর দিকে আতিয়া মহলের প্রায় দেড় শ গজ দূরে সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন সেনাবাহিনী। সংবাদ সম্মেলন চলাকালীন আতিয়া মহলএর জঙ্গি আস্তানা থেকে প্রায় আড়াই শ গজ দূরে প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এর প্রায় ৪৫ মিনিট পর আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। দ্বিতীয় বিস্ফোরণস্থলটি ছিল প্রথম বিস্ফোরণস্থল থেকে প্রায় একশ’গজ দূরে ।একটি পতিত জমিতে পড়ে থাকা গ্রেনেড নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে এ বিষ্ফোরণ ঘটে। । পর পর দু’টি ঘটনায় বোমা নিষ্ক্রিয় দলের সদস্য দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন।

এদিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানাধীন শিববাড়ি এলাকায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সময় আহত র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হচ্ছে রোববার বিকালের মধ্যে তাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে পাঠানো হবে বলে বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সূর্যবার্তা নিউজ ডটকমকে জানান । শনিবার সন্ধ্যার পর বিস্ফোরণে আহত আবুল কালাম আজাদের শরীরে কয়েক দফা অস্ত্রোপচার করা হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।শনিবার মধ্যরাতে তাঁকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়।একই ঘটনায় আহত মেজর আজাদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং তাঁকে ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে মুফতি মাহমুদ জানান।
২৫ মার্চ শনিবার সন্ধ্যায় শিববাড়ির জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় ঘটনাস্থলের খানিকটা দূরে দুই দফায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটে।বিষ্ফোরণে লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ও র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার উপ-পরিচালক মেজর আজাদ গুরুতর আহত হন। গুরুতর আহত র‍্যাবের দুই কর্মকর্তাকে শনিবার রাতেই সিলেট থেকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়।

রোববার সকালে ঘটনাস্থল থেকে বোমার স্প্লিন্টার সংগ্রহ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সিলেট মেট্রোপলিটনের পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, এখন পর্যন্ত ২ পুলিশসহ ৬ জন নিহত হওয়ার খবর আমরা নিশ্চিত হয়েছি। গুরুতর আহত ২ জনকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি ছিলো না বলে রোববার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সিলেটের পুলিশ কমিশনার । তবে আর কোনো প্রাণহানী যেন না ঘটে, সে জন্যই এমন কড়াকড়ি করা হয়েছে জানিয়ে এ সংকটময় পরিস্থিতিতে জনগণের সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেন বলে জানান এসএমপি কমিশনার।

পাঠানপাড়া সড়কের পাশে অবস্থিত পাঁচতলা ও চারতলাবিশিষ্ট দুটি ভবনের মালিক সিলেট নগরীর আতিয়া ট্রাভেলসের স্বত্ত্বাধিকারী দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ির বান্দরঘাটের (বন্দরঘাট) বাসিন্দা উস্তার মিয়া। গত জানুয়ারি মাসে প্রাণ কোম্পানির অডিট অফিসার পরিচয়ে কাওসার আহমদ ও মর্জিনা বেগম ওই বাড়ি ভাড়া নেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বিস্ফোরণস্থল পুরোপুরি কর্ডন করে রেখেছেন নিরাপত্তা বাহিনী। শনিবার রাতে বোমা বিস্ফোরণস্থল সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট সুরক্ষিত করে সাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত রেখেছে।

তবে চলমান এই অভিযান কখন শেষ হবে , তা বলেন নি এসএমপি কমিশনার। রোববার দুপুরে দুই পুলিশ কর্মকর্তার জানাজা শেষে সংবাদিকদের সাথে কথা বলেন এসএমপি কমিশনার ।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখা আতিয়া ভবনে শনিবার সকালে অপারেশন ‘টোয়াইলাইট’ অপারেশন শুরু করে সেনাবাহিনীর ১৭ পদাতিক ডিভিশনের প্যারা-কমান্ডো ব্যাটালিয়ন।
আতিয়া ভবন এলাকার বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আতিয়া ভবনে বসবাস কারী ২৮ টি ফ্ল্যাটের ৮০ জন বাসিন্দাকে নিরাপদে উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
পুলিশ চেকপোস্টে রক্তক্ষয়ী বোমা হামলায় জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম এবং ছাত্রলীগের ২ নেতা সহ ৬ ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বাইরে থেকে জঙ্গিদের আক্রমণ ঠেকাতে গোটা দক্ষিণ সুরমা এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

শনিবার সন্ধ্যার সেই হামলার পরপরই জনশূন্য হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। সেখানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া অন্য কাউকেই যেতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি সাংবাদিকদেরও ঘটনাস্থল এবং এর আশপাশে থাকতে নিষেধ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) গভীর রাতে দক্ষিণ সুরমার শিববাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান নিশ্চিত হবার পর সেই ভবন ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর প্রায় ৩০ ঘণ্টা যৌথ বাহিনী অবস্থান করে শনিবার (২৫ মার্চ) সকালে পুলিশের সহায়তায় অভিযান শুরু করেন সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডো বাড়িটিতে জিম্মি দশায় থাকা ৮০ জনকে উদ্ধার করা হলেও জঙ্গিদের সাথে গুলি বিনিময় চলছে এখনো। জঙ্গি দমন অভিযান এখনো শেষ হয়নি।

দু’দফা বিস্ফোরণে নিহত পুলিশ কর্মকর্তারা হলেন জালালাবাদ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম ও আদালত পুলিশের পরিদর্শক চৌধুরী মো. আবু কয়সার। তারা দু’জনই পুলিশের বোমা নিস্ক্রিয়কারী দলের সদস্য ছিলেন বলে জানান জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আখতার হোসেন। এছাড়া দক্ষিণ সুরমা উপজেলা ছাত্রলীগের উপ পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফাহিম, মহানগর ছাত্রলীগ নেতা ওয়াহিদুল ইসলাম অপু, নগরীর দাঁড়িয়াপাড়ার বাসিন্দা ডেকোরেটর ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম ও খাদিম শাহ ঘটনাস্থলে বোমা হামলায় নিহত হন ।

শনিবার সন্ধ্যায় আতিয়া মহলের কাছে একটি বাড়িতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন যৌথ বাহিনীর কর্মকর্তারা। এরপর সাংবাদিকসহ অন্যরা বের হয়ে সামনে এগোনোর সময় বোমা বিস্ফোরণের খবর আসে। দু’দফা বোমা বিস্ফোরণে রোববার (২৬ মার্চ) সকালে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ২ পুলিশসহ ৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সাংবাদিক, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যসহ ৩২ জন। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। আতিয়া মহল থেকে ৩০০ গজ উত্তরের রাস্তায় এ বোমার বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন, স্থানীয় একটি দৈনিকের সাংবাদিক আজমল হোসেন (৩০), দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি হারুনুর রশিদ এবং উৎসুক জনতার মধ্যে রিমন, নাজিম, রাসেল, ওহেদুল, ইসলাম আহমেদ, নুরুল আলম, বিপ্লব, হোসেন আবদুর রহিম, ফখরউদ্দিন, মামুন, রহীম, মোস্তাক, ফারুক মিয়া, সালাহউদ্দীনসহ ও কয়েকজন পথচারী রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, যৌথ বাহিনীর ব্রিফিং শেষে সবাই ওই রাস্তা ধরে ফেরার সময় প্রথম বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। সে সময় র‌্যাব-পুলিশ সদস্যরা অন্য একটি অবিস্ফোরিত বোমা দেখতে পান। নিরাপদ দূরত্বে সরানোর সময় ওই বোমাটিও বিস্ফোরিত হওয়ায় আহতের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।

শনিবার সকালে লে. কর্নেল ইমরুল কায়েসের নেতৃত্বে ‘অপারেশন টোয়ালাইট’ নামে অভিযানটি শুরু হয়। এরপর ৭৮ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে উদ্ধারের খবর জানিয়ে ১৭ পদাতিক ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান ব্রিফিংয়ে জানান, তারা ভালো আছেন, সুস্থ আছেন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

nine + thirteen =