প্রায় সাতশ মানুষ হত্যার অভিযোগে আটক এনএসআইর সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডিজিকে ট্রাইব্যুনালের সেফহোমে জিজ্ঞাসা করার অনুমতি

Facebooktwittergoogle_plusredditpinterestlinkedinmail

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রভাবশালী আসামি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) সংস্থার সাবেক ভারপ্রাপ্ত ডিজি মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে ট্রাইব্যুনালের সেফ হোমে জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন আদালত।

আগামী ১৫ মে তাকে তদন্ত সংস্থার সেফ হোমে নিয়ে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে। সে সময় তার পক্ষে একজন আইনজীবী ও ডাক্তার উপস্থিত থাকবেন।

বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দেন। আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও রেজিয়া সুলতানা চমন, প্রসিকিউটর সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নি, জাহিদ ইমাম ও তাপস কান্তি বল উপস্থিত ছিলেন।

পরে সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নি ও রেজিয়া সুলতানা চমন আদালতে   সূর্যবার্তাকে জানান, আজ বৃহস্পতিবার নির্ধারিত দিনে আসামিকে আদালতে হাজির করার পর তাকে ১৫ মে তদন্ত সংস্থার সেফ হোমে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছেন। এছাড়া ১০ জুলাই তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ওইদিন এই মামলার বিষয়ে শুনানির পরবর্তী তারিখ ঠিক করেন আদালত।

এর আগে (২৪ এপ্রিল) ব্লক- জে, রোড-২/ডি, বাড়ি নং-৩, বারিধারা থেকে ওয়াহিদুল হককে গ্রেফতার করা হয়। তার পরদিন আদালতে হাজির করার পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তালিকাভুক্ত করা হয়। সে অভিযোগের উপর ভিত্তি করে তদন্ত শুরু হয়।

ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে ২৮ মার্চ ১৯৭১ সালে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে প্রায় সাতশ মানুষকে মেশিনগানে হত্যার অভিযোগ রয়েছে বলে প্রসিকিউশন পক্ষ জানিয়েছেন।

এনএসআই’র এই সাবেক কর্মকর্তা ১৬ অক্টোবর ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে রংপুর ক্যান্টনমেন্টে যোগ দেন। মামলার নথি থেকে জানা যায়,  এরপর ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টে বদলি করা হয় তাকে। ১৯৭০ সালের মার্চে ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্ট রংপুর সেনা নিবাসে স্থানান্তরিত হলে ওয়াহিদুল হকও সেখানে চলে আসেন। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ পর্যন্ত ওই রেজিমেন্টের অ্যাডজুটেন্ট ছিলেন তিনি। ওই বছরই তিনি বদলি হয়ে আবার পাকিস্তানে (পশ্চিম পাকিস্তান) চলে যান। সেখানে তিনি ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করেন।

১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানে অবস্থান করে ১৯৭৪ সালে দেশে ফেরেন। ওই বছরের শেষে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।

পরে ১৯৭৬ সালে পুলিশ বাহিনীতে এএসপি পদে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রভাবশালী আসামি ১৯৯৬-৯৭ সালে  এনএসআই’র ভারপ্রাপ্ত ডিজি ছিলেন। সবশেষ ২০০৫ সালে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে অবসর নেন।

উল্লেখ্য, পেশাগত অসদাচরণ, শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সব মামলার কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ নভেম্বর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে করা মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ ওই আসামির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার আদেশ রয়েছে জানিয়ে তাকে পালিয়ে যেতে বলেন। এছাড়া, এ বিষয়ে ওয়াহিদুল হকের কাছে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। পরে বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার নজরে এলে প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজকে এ মামলা থেকে প্রাথমিকভাবে অব্যাহতি দেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর। পাশাপাশি এ ঘটনার তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত চলা অবস্থায় তার হাতে থাকা ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য মামলা থেকেও তুরিন আফরোজকে অব্যাহতি দেন চিফ প্রসিকিউটর। বুধবার (৯ মে) তুরিন আফরোজ বিরুদ্ধে অভিযোগের যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

গত মঙ্গলবার চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু স্বাক্ষরিত তুরিন আফরোজকে সব মামলার কার্যক্রম থেকে অব্যাহতির আদেশে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ০৭/০৫/২০১৮ তারিখের ২২৩ নং স্মারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ICT-BD caseNo.-1/2018 এর প্রসিকিউটর হিসেবে আপনার দায়িত্ব পালন থেকে বিরত ও প্রত্যাহারের ধারাবাহিকতায় অদ্য ০৮/০৫/২০১৮ ইং তারিখে আপনাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সকল মামলা থেকে বিরত ও প্রত্যাহারের আদেশসহ আপনার নিকট ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলার ডকুমেন্টস প্রসিকিউশন অফিসে জমা দেওয়ার আদেশ দেওয়া হলো।’

আদেশে আরো বলা হয়, ‘এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ICT-BD caseNo.-1/2018 তে ২৮/০৩/২০১৭ ইং তারিখে সংঘটিত রংপুর ক্যান্টনমেন্টের সন্নিকটে ৫০০/৬০০ মুক্তিকামী বাঙালি ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে হত্যার জন্য মেজর মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ আনা হয়েছে, যা তদন্তাধীন। আপনার স্বপ্রণোদিত ১৮/১১/২০১৭ ইং তারিখে আসামি মেজর (অব.) মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের এবং ১৯/১১/২০১৭ ইং তারিখে গুলশানের অলিভ রেস্টুরেন্টে আপনার সঙ্গে আপনার সহযোগী ফারাবিসহ মেজর মোহাম্মদ ওয়াহিদুল হক, তার স্ত্রী ও একজন মুরব্বির আলাপ ওয়াহিদুল হকের মোবাইলে ধারণকৃত প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার রেকর্ড তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে প্রসিকিউশন অফিসে প্রাপ্তির আলোকে প্রসিকিউশন তথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার ভাবমূর্তি রক্ষা ও স্বচ্ছতার জন্য জনস্বার্থে উক্ত অফিস আদেশ দেওয়া হলো।’

প্রসিকিউশন অফিসে গত ৭ মে আসামি ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে তুরিন আফরোজের গোপন বৈঠক নিয়ে যে অভিযোগ দাখিল করে, দুই পৃষ্ঠার ওই অভিযোগে স্বাক্ষর করেছেন তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক এম সানাউল হক। অভিযোগের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় বলা হয়, ‘১৯/১১/২০১৭ সন্ধ্যায় ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ তার সহযোগী ফারাবিসহ নির্ধারিত স্থানে (গুলশানের অলিভ রেস্টুরেন্টে) উপস্থিত হন। মেজর (অব.) ওয়াহিদুল হক, তার স্ত্রী ও পক্ষে একজন মুরব্বি উপস্থিত থাকেন। তথায় খাওয়াদাওয়ার সহিত এই মামলার মেরিট সম্পর্কে তুরিন আফরোজ বিরূপ মন্তব্য করেন। মামলাটি কেবল কিছু উৎসাহী লোকের চেষ্টায় হইতেছে বলে মন্তব্য করেন। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টার আলোচনার একপর্যায়ে তুরিন আফরোজ নীতিবহির্ভূতভাবে এই মামলায় তদন্ত সংস্থার সকল কাগজপত্রের ফটোকপি আসামির নিকট হস্তান্তর করেন।’

অভিযোগের শেষের দিকে বলা হয়, ‘তুরিন আফরোজ ও তার সহযোগী ফারাবি পরোক্ষভাবে মেজর ওয়াহিদুল হকের অর্থবিত্তের পরিমাণ নিরূপণের চেষ্টা করেন। তাহার নিকট বহু কোটি টাকা আছে বলে ধারণা প্রকাশ করেন।’

অভিযোগসংবলিত আবেদনের শুরুতে, এই আসামির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করতে তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে অবেহলার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া এই অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মেজর ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে তুরিন আফরোজের টেলিফোন আলাপ ও গুলশানের অলিভ রেস্টুরেন্টে কথোপকথনের পৌনে তিন ঘণ্টার রেকর্ডসংবলিত সিডি।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, মেজর ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে তুরিন আফরোজের টেলিফোন আলাপ ও গুলশানের অলিভ রেস্টুরেন্টে কথোপকথনের পৌনে তিন ঘণ্টার রেকর্ডসংবলিত সিডি আইন মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল রাতে জানা গেছে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নথি আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

five × four =